করোনা পরিস্থিতি

নিত্যপণ্যের বাজার চলছে অনলাইনে

       

রেজাউল হক কৌশিক

করোনা আতঙ্কে গোটা দুনিয়ার অর্থনীতি টালমাটাল। করোনা যাতে না ছড়ায় সেজন্য কোনো রকম ভিড় জমায়েত এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাইরে বের হচ্ছে না। বহু জায়গায় নেমে এসেছে লকডাউন। নিত্যপণ্যের দোকান খোলা থাকলেও অনেকেই বাসা থেকে বের হচ্ছেন না। ফলে এসব পণ্যের জন্য অনলাইনভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এমন অবস্থায় অনলাইন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রি বেড়েছে কয়েকগুণ। হঠাত্ করেই চাপ বেড়ে যাওয়ায় চাহিদামতো সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। তবে প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, পণ্যের মজুতে কোনো কমতি নেই, সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপের কারণেই অনেক ক্ষেত্রে সেবা দিতে দেরি হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য যেমন—চাল, ডাল, তেল, লবণ, চিনির মতো পণ্যগুলো অনলাইনে কেনার চাহিদা ২০ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। জীবাণুমুক্ত করার বিভিন্ন দ্রব্য যেমন—হ্যান্ড স্যানিটাইজার, সাবান, ঘর জীবাণুমুক্ত করার জীবাণুনাশকের মতো পণ্যগুলোরও চাহিদাও বেড়েছে। এছাড়া হ্যান্ড গ্লাভস, থার্মাল স্কানার, মাস্কসহ করোনা ভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে ব্যক্তিগত সুরক্ষার পণ্যগুলোও বেশ বিক্রি হচ্ছে বলে অনলাইনভিত্তিক বিক্রেতারা জানিয়েছেন। এসব বিক্রেতা বলছেন, সাধারণ ছুটির দিনগুলোতে অন্যান্য পণ্য যেগুলোর এখনই প্রয়োজন নেই এমন পণ্যগুলো আপাতত ডেলিভারি দেওয়া বন্ধ আছে। এখন শুধু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যগুলোর বিক্রির অর্ডার নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে একশ্রেণির ক্রেতা ভবিষ্যতের খারাপ অবস্থার কথা চিন্তা করে অনলাইন থেকে বেশি বেশি পণ্য কিনে তা মজুত করার চেষ্টা করছেন। তাদের এ মজুত ঠেকাতে এবং বেশিসংখ্যক গ্রাহকে পণ্য দিতে ব্যবস্থা নিয়েছে অনলাইন বিক্রেতারা। তারা বলছেন, একই ধরনের পণ্য যাতে বেশিসংখ্যক অর্ডার দিতে না পারে সেজন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যেমন—এক জন ব্যক্তি একই একাউন্ট থেকে কোনো পণ্য পাঁচটির বেশি অর্ডার করতে পারবেন না।

হঠাত্ করে অনলাইনে নিত্যপণ্যের ওপর চাপ বেশি হওয়ায় ডেলিভারি দিতে হিমশিম খাচ্ছে অনেক কোম্পানি। এ সময়ে ডেলিভারিম্যানও অনেক কমে গিয়েছে। কারণ, করোনা আতঙ্কে অনেকে রাজধানী ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন। আবার অনেক ডেলিভারিম্যান যারা ঢাকায় আছেন তারাও কাজে বের হচ্ছেন না। অবশ্য ডেলিভারি কর্মীরা যাতে করোনা ভাইরাস থেকে মুক্ত থাকে এজন্য কোম্পানির পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তাদের হ্যান্ড স্যানিটাইজার, গ্লাভস, মাস্ক, পার্সোনাল প্রোটেকশন ইকুইপমেন্ট (পিপিই) দেওয়া হচ্ছে। আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যাতে ডেলিভারি কর্মীদের সম্পর্কে জানতে পারে সেজন্য তৈরি করা হয়েছে বিশেষ অ্যাপস।

দারায বাংলাদেশের চিফ অপারেটিং অফিসার খন্দকার তাসফিন আলম ইত্তেফাককে বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যগুলোর চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটা ২০ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। অর্ডার অনুযায়ী ডেলিভারি দিতে কর্মীদের অতিরিক্ত সময় দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ডারাজ ডটকমের প্রায় ১৫০০ এর মতো ডেলিভারিম্যান আছে। তাদের মধ্যে ৬০ ভাগের মতোই প্রতিদিন কাজে যোগ দিচ্ছে। করোনা আতঙ্কে অনেকেই আগে আসছিলেন না। তারাও কাজে আসতে শুরু করেছে। সব ধরনের নিরাপত্তা রেখেই কাজগুলো করার চেষ্টা করছি আমরা। পণ্যের মজুত বিষয়ে তিনি বলেন, এখনো পর্যন্ত যে অবস্থা আছে তাতে আমরা নির্বিঘ্নে আমাদের অর্ডারগুলো দিতে পারছি। তিনি বলেন, এখন শুধু ঢাকার মধ্যে আমরা ডেলিভারি দিচ্ছি। এ সপ্তাহের শেষ নাগাদ ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে আমরা ডেলিভারি দিতে শুরু করব।

ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের কাছে পণ্য বিক্রি করে সিন্দাবাদ ডট কম। এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জিসান কিংশুক হক ইত্তেফাককে বলেন, আমরা ব্যাংক, বিমাসহ করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাধারণত পণ্য সরবরাহ করে থাকি। সাধারণ ছুটির কারণে এসব প্রতিষ্ঠানে বিক্রি শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। তবে প্রয়োজনের তাগিদে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও খুচরা পর্যায়েও আমরা বিক্রি করছি। তিনি বলেন, আমাদের মতো বড়ো কোম্পানির মজুত নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। তবে উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও আমদানিকারকরা আমাদের কতদিন সরবরাহ করতে পারবে সে বিষয়ে কিছুটা সংশয় রয়েছে। ডেলিভারি কর্মীদের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির কথা চিন্তা করে সব ধরনের দূরত্ব বজায় ও ব্যক্তিগত সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যাতে ডেলিভারি কর্মীদের সম্পর্কে জানতে পারে সেজন্য বিশেষ একটি অ্যাপস বাসানো হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ২৩টা কোম্পানির সাড়ে ৯ হাজার ডেলিভারি কর্মীদের একটি ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে। যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে দেওয়া আছে। প্রয়োজনে ডেলিভারি কর্মীদের ছবি, ন্যাশনাল আইডিসহ অন্যান্য তথ্য যাতে জানতে পারেন।

চালডাল ডট কমের হেড অফ গ্রোথ ওমর শরীফ বলেন, মার্চ মাসের শুরু থেকেই অর্ডার বাড়তে শুরু করেছে। গত মাসের তুলনায় আড়াই থেকে তিনগুণ রেভিনিউ বেড়েছে। তিনি বলেন, এখনো মানুষ শঙ্কার মধ্যে রয়েছে। এজন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যগুলোই বেশি অর্ডার করছে। গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য দেওয়ার মতো যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে বলেও জানান তিনি।