চিকিত্সা-সংকট বনাম ডাক্তার-নার্সদের সুরক্ষা

মীর আব্দুল আলীম

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস আতঙ্কে সাধারণ রোগীদের চিকিত্সা-সংকট তৈরি হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে ডাক্তারের সংকট। চেম্বার করছেন না অনেক চিকিত্সক। দেশ জুড়ে এমন স্বাস্থ্য-সংকটে জনমনে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। করোনা ভাইরাসে নয়; অন্য রোগেই এখন দেশের মানুষ চিকিত্সার অভাবে চিকিত্সা পাচ্ছে না। এটা ভাবতেই যেন গা শিউড়ে ওঠে। কেন এমন হলো? করোনা আতঙ্কে সরঞ্জামের অভাবে স্বাস্থ্যনিরাপত্তার কথা ভেবে ডাক্তারগণ রোগী দেখা কমিয়ে দিয়েছেন। অনেক হাসপাতালের আউটডোরে ডাক্তার নেই বললেই চলে। রাজধানী ঢাকার নামিদামি হাসপাতালেও ডাক্তারের সংকট চলছে। তাতে সাধারণ রোগীদের চিকিত্সা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্যসেবায় যা চলছে এভাবে কি চলে? করোনা ভাইরাস, এ রোগ দুনিয়া জুড়ে। রোগের জন্য; রোগীর জন্য চাই ডাক্তার। ডাক্তার না থাকলে রোগীরা তো বড়ো অসহায়। কারা চিকিত্সা দেবেন রোগীদের? চিকিত্সা মহান পেশা। রোগীর জন্য ডাক্তার নিবেদিত হবেন এটাই সত্য। ডাক্তারগণ বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে এখন চেম্বারও করতে চান না। বিপাকে পড়েছে হাসপাতালগুলো। এভাবে চলে না। দুঃসময়ে ডাক্তারদেরই প্রয়োজন আগে। তাদের সম্মান দেখাতে হবে। পেশার মর্যাদা দিতে হবে। স্বাস্থ্য-সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

চিকিত্সা বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বর্তমানে চিকিত্সাব্যবস্থায় চরম সংকট চলছে। কে কারোনা ভাইরাসে আক্রান্ত আর কে আক্রান্ত না তা শনাক্ত করা কঠিন। ফলে চিকিত্সকরা আতঙ্কে আছেন। তারা যে কোনো রোগী দেখলে মনে করেন তার শরীরে করোনা ভাইরাস থাকতে পারে। অন্যদিকে, নিজের সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে অনেক চিকিত্সক রোগী দেখা বন্ধ করে দিয়েছেন। অনেকেই চেম্বারে যাচ্ছে না। শুধু রাজধানীর হাসপাতাল ও ডাক্তারদের চেম্বারই নয়, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরসহ দেশের সব বিভাগ ও জেলায় এ চিকিত্সা-সংকট চলছে। বহু রোগী ইনফ্লুয়েঞ্জা জ্বর, সর্দি-কাশিতে ভুগছেন। তারা চিকিত্সকদের চেম্বারে চেম্বারে ঘুরে চিকিত্সা পাচ্ছেন না। অনেক সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগে রোগীদের চিকিত্সা না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আবার ভর্তিকৃত রোগী সুস্থ হওয়ার আগেই ছাড়পত্র দেওয়ার অভিযোগও আছে। অনেক জায়গায় চিকিত্সকদের প্রাইভেট চেম্বার ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার করোনা আতঙ্কের কারণে বন্ধ করে দেওয়ায় রোগীরা চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।

একথা কিন্তু সত্য, আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়া পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ছাড়া আমাদের ডাক্তারগণ যে চিকিত্সাসেবা দিচ্ছেন তা কম নয়। হাল সময়ে করোনা ভাইরাস নিয়ে ডাক্তারদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে এবং তা থেকে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা রীতিমতো দমবন্ধ হয়ে আসার মতো। এখন ঢাকা শহরেও অন্য রোগের চিকিত্সা মিলছে কম। সবখানে করোনা ভাইরাসের ভয়। জ্বর, ঠান্ডা হলে তো কথাই নেই। এ পরিস্থিতিতে প্রথমে রোগীর ইনফ্রারেড থার্মোমিটারের মাধ্যমে শরীরের তাপমাত্রা নির্ণয় করে জ্বর, সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত রোগীকে নির্দিষ্ট স্থানে পাঠাতে হবে। আর চিকিত্সক পিপিই পোশাক পরে রোগীর চিকিত্সা দিবেন। চিকিত্সার ক্ষেত্রে টেলিমেডিসিনের সাধারণ রোগের চিকিত্সা করা যেতে পারে। যা আমাদের দেশে চর্চা খুব কম। সরাসরি চিকিত্সার ক্ষেত্রে ডাক্তারদের পিপিই পরে নেওয়া বাধ্যতামূলক। পিপিই প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ হোসেন বলেন, যেখানে দরকার সেখানে পিপিই ব্যবহার করতে হবে। জ্বর, সর্দি ও হাঁচি-কাশির রোগী দেখার সময় অবশ্যই পিপিই (পারসোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট) পোশাক ব্যবহার করতে হবে। এর বিকল্প নেই। পর্যালোচনায় আমরা কী দেখতে পেলাম? কর্তব্য পালনকালে মর্যাদার অভাবে চিকিত্সকদের মধ্যে আতঙ্ক এবং অনীহা তৈরি হয়েছে। যার কারণে দেশে চিকিত্সার এ সংকট। এ সংকট সহসাই দূর করা না গেলে দেশে স্বাস্থ্য-বিপর্যয় চরম আকার ধারণ করবে। আর তা সরকারের সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি অতিদ্রুত ভাবনায় আনবেন বলেই আশা রাখি। রোগীদের সেবার অন্যতম মাধ্যম চিকিত্সক। তাদের সব সমস্যা সমাধানপূর্বক এ অচলাবস্থার সুরাহা না করা গেলে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম অনিশ্চিত হয়ে পড়বে তাতে সন্দেহ নেই। আমরা এর দ্রুত সমাধান চাই।

n লেখক :গবেষক