বাংলাদেশে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা কতটা সম্ভব?

করোনা ভাইরাসের বিস্তার রোধ করার জন্য সোশ্যাল ডিস্ট্যান্স বা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন চিকিত্সকরা। কিন্তু সামাজিক দূরত্ব ব্যাপারটা কী? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে সামাজিক দূরত্ব হচ্ছে, সংক্রামক রোগ বিস্তার প্রতিরোধের জন্য সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ওষুধবিহীন পদক্ষেপ। সামাজিক দূরত্ব স্থাপনের উদ্দেশ্য হলো— সংক্রামক রোগ বহনকারী ব্যক্তির মাধ্যমে অন্য মানুষের সংস্পর্শ এড়ানো। একই সঙ্গে আক্রান্ত ব্যক্তি যেন অপরের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে না পারে সেই ব্যবস্থা নেওয়া।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ-ও বলছে, সামজিক দূরত্ব বজায় রাখতে নিজের বাসায় থাকা, ভিড়ের মধ্যে না যাওয়া, এক জন আরেকজনকে স্পর্শ না করা। ধনী ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হলেও বাংলাদেশের বাস্তবতায় নিম্নবিত্ত এবং দরিদ্র পরিবারের পক্ষে এটা মানা একেবারেই সম্ভব নয়।

চিকিত্সকরা বলছেন, বাংলাদেশের জন্য কমপক্ষে ৩ ফুট দূরত্বে অবস্থান করতে হবে। ইউরোপ আমেরিকায় এই দূরত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ ফুট। বাইরে বের হলে তো অবশ্যই এই দূরত্ব মেনে চলতে হবে। সম্ভব হলে নিজ বাসাতেও এ দূরত্ব বজায় রাখুন।   ১ কোটির বেশি জনসংখ্যাবিশিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বাধিক জনঘনত্ববিশিষ্ট দেশ। এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১ হাজার ১৪৬ জন বাস করে। এই ঘনবসতিপূর্ণ দেশে নভেল করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি আমরা কী এই লকডাউন করে কাটাতে পারব! বাস্তবতা বলছে, আমরা এড়াতে পারব না। কোনো সচেতনতাই তাদের এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা থেকে বের হওয়ার কোনো পথ দেখাচ্ছে না।

সারি সারি ঘর। ঘরে যাওয়ার জন্য আছে গলি। গলিই ভরসা। আর কিছু নেই। সেই গলিতে দুই জন মানুষ পাশাপাশি হাঁটা যায় না। সরু গলির দুই ধারে সারি সারি ঘর। হাঁড়ি-পাতিল, বিছানা, কাপড়-চোপড়, খাটের নিচে নানান জিনিস। কোন মতে মাথা গোঁজার ঠাঁই। এমন ঘরেই ছয় থেকে সাত জন মানুষের বাস। রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানে করাইল বস্তির এমনই চিত্র দেখা গেল।

বাংলাদেশের বাস্তবতা হচ্ছে, ১০ বাই ১০ ফুটের একটি ঘরে ৭ থেকে ৮ জন লোক গাদাগাদি করে থাকছে। একটি বস্তিতে এইরকম ঘর সারি সারি শত শত। তিন থেকে চারটি টয়লেটে কমপক্ষে ৪০ জন মানুষ ব্যবহার করে। এদের জীবনযাত্রার মান খুবই করুণ। বস্তি এলাকায় সীমাহীন ঘনবসতির সঙ্গে নিরাপদ খাওয়ার পানি ও ন্যূনতম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য পর্যাপ্ত পানির সরবরাহ না থাকায় পুরো পরিবেশই দূষিত হয়ে পড়ে। এমন অস্বাস্থ্যকর দমবন্ধ পরিবেশ থেকে মুক্তি পেতেই সবাই বের হয়ে আসছে রাস্তায়। আড্ডা মারছে দোকানে। গত রবি ও সোমবার রাজধানীর বিভিন্ন বস্তি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ঘুরে এই চিত্র দেখা গেছে।

রায়ের বাজারের বালুর মাঠ, সাদেক খান বাজার এলাকা, রায়ের বাজার বধ্যভূমির পাশের ‘নামা এলাকা’ নামে পরিচিত বস্তি ঘুরে মানুষের সরব উপস্থিতি চোখে পড়ে। রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউ কিংবা মতিঝিলের শাপলা চত্বর দেখে যারা মনে করছেন দেশে লকডাউন খুব ভালো মতোই করা গেছে। বস্তি এলাকায় গেলে তাদের সেই ভুল ভেঙে যেতে বাধ্য।

শুধু তাই নয়, কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে যে রাস্তা পাইকপাড়ার দিকে গেছে, কিংবা আগারগাঁওয়ের ৬০ ফুট রাস্তা বিভিন্ন মোড়ে ১০-১৫ জনের মানুষের ভিড়। কিশোর থেকে বৃদ্ধ সন্ধ্যা হলেই সবাই বেরিয়ে আসছেন রাস্তায়। ঘিঞ্জি এলাকায় ছোট্ট ঘরে এই চারদিনেই তারা অতিষ্ট হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসছেন। তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

এটা তো রাজধানীর চিত্র। গ্রামের চিত্রও এর চেয়ে ভালো কিছু না। মাদারীপুরের ডুরাইল ইউনিয়নের খালাসিকান্দি গ্রামের বাসিন্দা মোশাররফ হোসেন চাকরি করেন ঢাকায়। লকডাউনের ছুটিতে গেছেন বাড়িতে। তিনি বললেন, তার চাচাতো ভাই এসেছে বিদেশ থেকে। বাড়ি ফিরেই সে ভাইদের বাসায় ঘুরতে এসেছে। করোনা সংক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি থাকায় পুরো পরিবার মিলে তাকে ঘরেই থাকতে বলেছে। সে ঘরে থাকলেও গোসল, টয়লেট ব্যবহারের জন্য তিনি বাইরে বের হচ্ছেন। একই উঠানের চার ধারে চার ভাগ-ভাগির বাড়ি। এই ভিটার বাসিন্দারা সবাই ঝুঁকিতে। ইচ্ছা করলেও বাস্তবতার কারণে কেউ সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে পারছেন না।

গ্রামের আরেকটি বড়ো ঝুঁকির স্থান হচ্ছে বাজার ও হাট। যেখানে অনিয়ন্ত্রিতভাবেই মানুষের সমাগত হয়। আর সামাজিক দূরত্বে কোনো তোয়াক্কাই কেউ করছে না। সামাজিক সংক্রমণের জন্য বড়ো ঝুঁকিতেই গ্রামের হাট-বাজার।

শহর এলাকায় বড়ো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে দলিত জনগোষ্ঠী। যাদের শহর পরিষ্কার করার জন্য নিয়মিত বের হতে হয়। অফিস-আদালত বন্ধ থাকার কারণে তাদের গতিবিধি কিছুটা কমলেও যারা আবাসিক ভবনের পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন তাদের মাধ্যমেও ‘সামাজিক সংক্রমণ’ এর ঝুঁকি রয়েছে।