করোনা মোকাবেলায় ছিন্নমূল মানুষের পাশে ‘সেপটোস ফোর’

করোনা আতঙ্কে বাংলাদেশসহ কাঁপছে পুরো বিশ্ব। সংক্রমণ এড়াতে সবাইকে দীর্ঘ সময়জুড়ে কোয়ারেন্টাইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে সরকার। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। জনসমাগম এড়াতে পালন করা হয়নি জাতীয় দিবসও। গত ২৬ মার্চ থেকে একরকম ঘরবন্দি দেশের অধিকাংশ মানুষ। খুব প্রয়োজন ছাড়া কেউই বের হচ্ছেন না বাসা থেকে।

এ তো গেল আপনার-আমার মতো সমাজের নিম্ন-মধ্যবিত্ত থেকে এর উপরের সারির কিংবা চাকুরিজীবী অথবা ব্যবসায়ীর কথা। কিন্তু প্রতিদিন অগণিত মানুষ রাস্তায় নামলেই শুধুমাত্র যাদের দিন শেষে খাবার জোটে, সেই মানুষগুলো এখন পড়েছে চরম বিপাকে। দিন এনে দিন খাওয়া এই মানুষগুলোর এই মুহূর্তে কোনো কাজ নেই, ফলে উপার্জনও একদম শূন্যের কোঠায়। অনেকেই দিন কাটাচ্ছেন না খেয়ে অথবা এক বেলা খেয়ে। আবার অনেকে বসে আছেন সাহায্যের অপেক্ষায়।

ছিন্নমূল মানুষের এই দুর্বিসহ অবস্থা যে শুধু বড় শহরগুলোতে, তা নয়। এটা এখন সমগ্র বাংলাদেশের চিত্র। আগামী ১১ তারিখ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে সাধারণ ছুটি। সাধারণ জনগণকে থাকতে বলা হয়েছে নিজ নিজ বাড়িতে। কিন্তু যাদের বাড়ি নেই এই দীর্ঘ সময়জুড়ে তাদের কি হবে? অনেকেই মাসের বেতন পেয়েছেন, বাজার করেছেন আগামী কয়েকদিনের জন্য। কিন্তু যাদের সারাদিনের উপার্জনের টাকায় রাতের খাবারের ব্যবস্থা হয়, তারাই এখন সবচেয়ে বিপাকে। করোনার হাত থেকে রক্ষা পেলেও এই পরিস্থিতি থেকে যেন তাদের কোনোভাবেই রক্ষা নেই।

এমনই একজন রুহুল আমিন। পেশায় রিকশাচালক। তিন সন্তান ও  স্ত্রী নিয়ে পাঁচ জনের সংসার। করোনা ভাইরাস এর কারণে সব কিছুই এখন বন্ধ। রাস্তায় নেই কোন যাত্রী। সেজন্য গত তিন দিন হলো ছোট্ট একটা ঘরে বসে আছেন রুহুল আমিন। কথা বলে জানা গেল ঘরে খাবার ও শেষ। এখন কি করে বাচ্চাদের মুখে খাবার তুলে দিবেন সেই চিন্তায় বিভোর তিনি। এমন দৃশ্য এখন প্রতিটি সমাজেই দেখা যাচ্ছে। এই অসহায় মানুষদের পাশে মানবতার স্বার্থে জীবন বাজি রেখে দাঁড়িয়েছে বেশ কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। ফরিদপুরের সদরপুর, ভাঙ্গা ও চরভদ্রাসনের নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে খাদ্যসহায়তা ও করোনাভাইরাস প্রতিরোধে গণসচেতনতা কার্যক্রম শুরু করেছে সেপটোস ফোর নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।   

সেপটোস ফোরের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি হাওলার শামীম আহমেদ বলেন, করোনা ভাইরাস নিয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা, মাস্ক ও হ্যান্ড সেনিটাইজার বিতরণ, অসহায় দরিদ্র মানুষের বাড়িতে গিয়ে খাদ্য পৌঁছে দেওয়া, লিফটের বিতরণ করা, গণপরিবহন এড়িয়ে যেতে বলা ছাড়াও এই অবস্থায় মানুষ যেন বাসা থেকে বের না হতে হয়, সেজন্য আমরা জরুরি ঔষধসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সামগ্রী বাড়িতে পৌঁছে দিচ্ছি। এই কাজে আমাদের সব সময় সহায়তা করেছেন উপজেলা প্রশাসন ও সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন এমপি।

বর্তমানে সেফটোস ফোর তাদের কাজগুলোকে তিন ভাগে করে নিয়েছে। সদরপুর উপজেলার তিনটি থানা হলো, সদরপুর, চরভদ্রাসন ও ভাঙ্গা। প্রথমে  সদরপুর উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় নিজেরা মাস্ক ও সেনিটাইজার তৈরি করে স্বল্প মূল্যে বিক্রি করে এবং তা থেকে ২/৩ টাকা করে যে লাভ হচ্ছে তা দিয়ে সমাজের ছিন্নমূল মানুষ, বন্ধ হয়ে যাওয়া ছোট ছোট দোকানদার, রিকশা চালক, দিনমজুর ও অসহায়দের মাঝে প্রতিদিন ৫০ জনকে ৫ কেজি চাল, ১ কেজি ডাল, ১ কেজি লবণ, এক প্যাকেট তেল ও একটি করে মাস্কের প্যাকেট দিয়ে আসছে সেচ্ছাসেবী সংগঠনটি।

করোনা  মোকাবেলায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো সচেতনতা।  তাই সংগঠনটি মানুষকে সচেতন করার জন্য এলাকায় এলাকায় টিম করে কাজ করে যাচ্ছেন। অটো ও ভ্যানের মাধ্যমে হ্যান্ড মাইক দিয়ে প্রতিদিনই এলাকার মানুষকে সচেতন করা হয়। সেই সাথে সচেতনতা মূলক লিফলেট ও বিতরণ করে তারা।

সংগঠনের আরেকটি টিম কাজ করে সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন এমপির সার্বিক সহযোগিতায়। এখানে তারা প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মানুষকে বিনামূল্যে চাল, ডাল,আলু, সাবান, সেনিটাইজার ও  মাস্ক বিতরণ করে আসছেন। যতদিন দেশের পরিস্থিতি ভালো না হয় ততদিন সাহায্য দিবেন বলে জানান সভাপতি ও প্রতিষ্ঠাতা হাওলার শামীম আহমেদ।

সেপটোস ফোরের সদস্যরা বলেন, পাঁচ আঙুলের চাপ দিয়ে দেশ ও জনগণের সেবার শপথ নিয়েছি। নিরাপত্তার স্বার্থে আপনারা বাড়িতে থাকুন।  আপনাদের স্বার্থে আমরা আছি, সব সময়, সব পরিস্থিতিতে। দোয়া করবেন আমাদের জন্য। দেশের স্বার্থে নিজেকে সর্বোচ্চ উৎসর্গ করতে সদা প্রস্তুত সেপটোস ফোর টিম।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সেপটোস ফোর ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে সদস্য প্রায় ১১০০ জন। সেপটোস ফোর শীতার্তদের মধ্যে কম্বল বিতরণ, বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ, সচেতনতা মূলক শর্টফিল্ম নির্মাণ,স্বেচ্ছায় রক্তদান, বৃক্ষ রোপণ, মাদক বিরোধী কর্মসূচি,মেধাবী গরীব শিক্ষার্থীদের মাঝে বৃত্তি প্রদান সহ নানান কাজ করে আসছেন। আর এই সব কার্যক্রমের অর্থায়ন এলাকার বৃত্তবানরা এবং  নিজেরা চাঁদা তুলে করে থাকেন।

সংগঠনটির প্রধান উপদেষ্টা ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন এমপি এবং উপদেষ্টা পরিষদে রয়েছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার পূরবী গোলদার, এসিল্যান্ড সজল চন্দ্র, সদরপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ড. কাকলী মুখোপাধ্যায়, অধ্যাপক সৈয়দ জাহিদ হাসান এবং সমাজ সেবক রিপন হাওলাদার।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি