ভুল বুঝবেন না; অভিযোগ নয়, কিছু প্রশ্ন

আমার জা একটা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কাজ করে। গত ২৫ তারিখ  থেকে সেটা বন্ধ। কারণ ওখানে  যে ডাক্তারটা বসেন তারা ২০ তারিখের পর  থেকে বসছেন না। বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি আমরা সবাই জানি। এই দেশটির চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কেও জানি। ডাক্তাররা বসছেন না প্রাইভেট প্রাকটিস করছেন না এটা অবশ্যই তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। এই সিদ্ধান্ত  নেবার স্বাধীনতা তাদের আছে। আমরা বুঝতে পারি তারা তাদের নিরাপত্তার কথা  ভেবেই হয়ত বসছেন না।

গত কয়েকদিন ধরেই আমরা  দেখতে পাচ্ছি করোনা রোগী নয় কিন্তু সাধারণ রোগেরও চিকিৎসা হচ্ছে না। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন, কিন্তু তারা চিকিৎসা পাচ্ছেন না। কারণ হাসপাতালগুলো রোগী নিচ্ছে না। অনেকেই বলছেন যে  দেশের নামকরা  বেসরকারি হাসপাতালগুলোর আইসিইউগুলোও নাকি এখন রোগী নিচ্ছে না। এমন কি জরুরি বিভাগও সেভাবে কার্যকর নেই। এই হাসপাতালগুলো বলছে তাদের অন্য রোগীর নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই তারা এমনটি করেছে। কোনো কোনো হাসপাতাল নোটিশ দিয়ে দিয়েছে সর্দি কাশির রোগী তারা চিকিৎসা করবেন না। তারাও এটা করেছেন অন্য রোগীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে। সেটাও আমরা বুঝতে পারছি।

ডাক্তাররা সেবা দিতে পারছেন না কারণ পর্যাপ্ত পিপিই নেই বলে তারা দাবি করছেন। আমরা দেখেছি পাবলিক হাসপাতালগুলোর ডাক্তাররা কর্মবিরতি করছেন উপযুক্ত নিরাপত্তার সামগ্রীর জন্য। অবশ্যই তাদের এই কর্মবিরতি যুক্তিযুক্ত অবশ্যই ডাক্তারদের নিরাপত্তা আগে নিশ্চিত করতে হবে। তারপরই তাদের সেবা পাবার প্রশ্ন উঠে। আমার মিডিয়ায় এখন সংবাদ দেখছি পিপিই এসেছে। সরকার বলছে নিরাপত্তা সামগ্রী এসেছে। ডাক্তারদের দেয়া হচ্ছে। আলাদা করে হাসপাতাল ও হাসপাতালে আলাদা ইউনিট চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে করোনার চিকিৎসা হবে।

করোনার জন্য এ সকল ব্যবস্থা গ্রহণের পর ও দেখা যাচ্ছে কয়েক হাসপাতাল ঘুরেও করোনা নয় অন্য রোগীর জন্যও আত্মীয়রা আইসিইউ পাননি।  রোগী মারা গেছেন। আমাদের এক সহকর্মী লেখেন তাদেও ক্যান্সার পেশেন্টের জন্যও তারা আইসিইউ পাননি।  সাধারণ রোগের চিকিৎসাও দারুণ ভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে বাংলাদেশের সাধারণ চিকিৎসা ব্যবস্থাও ভেঙ্গে পড়েছে। করোনা তো পরের কথা।

করোনা অবশ্যই একেবারেই অন্য একটা বিষয়। এটা নিয়ে উন্নত বিশ্বই হিমসিম খাচ্ছে আর আমাদের মতো একটি জনবহুল এবং উন্নয়নশীল  দেশের জন্য এটি তো অবশ্যই  জটিল সংকট ও ব্যাপক সমস্যার বিষয়। এ বিষয়ে  কোনো সন্দেহ বা দ্বিমত কারোরই নেই যে এই দেশে ডাক্তাররাও নানা সীমাবদ্ধতায় সেবা দিয়ে থাকেন। এটা আমাদের অবশ্যই মানতে হবে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে ডাক্তারদের কাজ করতে হয়। এজন্য তারা ধন্যবাদ পাবারও যোগ্য। এই দেশের বাস্তবতায়ই আসলে আমাদের সকলের কাজ করতে হয়। এই  লেখার উদ্দেশ্য  কোনো পেশার বিরুদ্ধে বলা নয়। আমার অনেক আপনজনও ডাক্তারি পেশায় আছেন। কিন্তু এই যে বিদ্যমান পরিস্থিতি  যেখানে সাধারণ রোগীরাও চিকিৎসার জন্য ভোগান্তিতে আছেন সেখানে আমার কয়েকটি বিষয় আলোকপাত করা জরুরি-

এক. পাবলিক হাসপাতালের ডাক্তারদের পিপিই সরকার  দেবেন। অবশ্যই নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে ডাক্তাররা  সেবা দিবেন না। তাদের পিপিই ও অন্যান্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

দুই . বেসরকারি হাসপাতাল এবং ক্লিনিকে পিপিই কি সরকার  দেবেন? কেন  দেবেন? যদি সরকার  সেখানে চিকিৎসার ইউনিট খোলেন তাহলে অবশ্যই দিবেন। তা না হলেও কি দেবেন?

তিন. করোনা যেহেতু খুবই সংক্রামক এবং এর চিকিৎসা এখনো অজ্ঞাত তাই সব বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক এই রোগের সেবা দিবে না। সব হাসপাতালেও করোনার চিকিৎসা হবে না। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অন্য রোগের চিকিৎসার জন্য এগুলো কেন সেবা দেবে না?

চার. অন্য রোগের সেবা দিতে গেলেও করোনা রোগী চলে আসতে পারে সেই জন্য অন্য রোগের সেবার ক্ষেত্রেও এখন পিপিই ব্যবহারের প্রয়োজন পড়তে পারে। যদি তাই হয় তবে কেন সেই পিপিই ক্লিনিক বা হাসপাতাল সরবরাহ করবেন না। বাংলাদেশে প্রাইভেট চিকিৎসা ও হাসপাতাল ব্যয়বহুল আমরা কে না জানি। রোগীর থেকে যদি টাকাই নেয়া হয়, তবে কেন তারা ডাক্তারদের পিপিই দেবেন না।

পাঁচ. যারা প্রাইভেট প্রাকটিস করেন তাদের পিপিই কে দেবে? সরকার কি দেবে? কেন দেবে? তারা তো যথার্থ ভিজিট নেয়ার বিনিময়েই রোগী  দেখেন। তারা যদি রোগী দেখে আয় করতে পারেন তবে তাদের এই আয়ের জন্য ( যদিও রোগী দেখা সেবাও বটে) কেন তারা নিজেদের টাকায় পিপিই কিনবেন না?

ছয়. সবার মানসিক শক্তি এক নয়। পিপিই পাবার পরেও কোনো ডাক্তার প্রাইভেট প্রাকটিস না করতে পারেন। তিনি হয়তো এটা করতে চান না। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই বলার কিছু নেই ব্যক্তিস্বাধীনতা সবার আছে। কিন্তু হাসপাতালে, ক্লিনিকে যারা কাজ করেন তারা কি দিনের পর দিন রোগী না দেখে থাকতে পারেন? তাদের কি ব্যক্তি ইচ্ছার বাইরে সামাজিক দায়বদ্ধতা নেই?

সাত. আমাদের দেশের ডাক্তাররা কি রোগীদের প্রাইভেট চিকিৎসা করেই একটা সচ্ছল জীবন পেয়েছেন? প্রাইভেট প্রাকটিস আর বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে কাজ করেই কী ভালো আয় করেছেন না তারা? এটা কি অস্বীকার করতে পারবেন? তাহলে এখন এই সংকটকালে রোগীর প্রাইভেট চিকিৎসায় কেন পিপিই কিনতে পারবেন না? প্রয়োজন হলে রোগীর কাছ থেকে সামান্য বাড়িয়ে নিন। কিন্তু চিকিৎসা কেন করা হবে না?

একজন ডাক্তার তৈরি করতে পরিবারের অনেক ত্যাগ অনেক কষ্ট আর বিনিয়োগ থাকে। যারা পাবলিকে পড়েছেন তাদের জন্য রাষ্ট্রেরও বিনিয়োগ থাকে। অবশ্যই পরিবার চাইবে তার সন্তানের এবং তার এই আপনজনের নিরাপত্তা। রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে আমরাও চাই ডাক্তারসহ সবার নিরাপত্তা।  নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমাদের  কোনো সমঝোতা নেই। ডাক্তারদের নিরাপত্তা যেমন তাদের অধিকার। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে চিকিৎসা পাওয়াও আমাদের অধিকার। আমাদের ডাক্তাররা আমাদের সম্পদ। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক। সাধারণ মানুষের চিকিৎসাও নিশ্চিত হোক। মানুষ মরণশীল, মরবেই। তবে কেউ এই আধুনিক প্রযুক্তির যুগে চিকিৎসা ছাড়া মারা যাক আমরা তা চাই না।

ইত্তেফাক/আরএ