এশিয়া অঞ্চলে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে বাংলাদেশ

কৃষি খাতে বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে বেশ এগিয়েছে। প্রধান শস্য চালে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে এ দেশ। এ জন্য অবশ্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাই সবচেয়ে বড়ো ভূমিকা রেখেছে। কৃষিক্ষেত্রে আজকাল আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছেন সবাই। বিদ্যুত্ ও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার কৃষিজমিতে সেচের ক্ষেত্রে নতুন বিপ্লব এনেছে। প্রথম দিকে এদেশের কৃষক বিদেশি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে উন্নাসিকতা দেখালেও পরবর্তী সময়ে এর সুফলের নানা দিক উপলব্ধি করেছেন। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং নতুন যুগোপযোগী পদ্ধতি ব্যবহারে উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই এসবের প্রতি কৃষকদের উত্সাহ দিনে দিনে বাড়ছে। অতীতের প্রযুক্তি এখন পুরোনো ও অচল হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কারণ এর মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উত্পাদনশীলতাকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। পুরোনো প্রযুক্তি প্রয়োগে সুফল পাওয়ার আশা করাটাই বৃথা এখন। নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় খাদ্যের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত সবাই। মান্ধাতার আমলের পদ্ধতিতে চাষাবাদ করলে খাদ্যের নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়ে যাবে। কাজেই খাদ্যের নিরাপত্তাসহ সামগ্রিক কৃষি খাতকে দীর্ঘস্থায়ীভাবে টেকসই ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন, সংযোজন ও সংস্কার কার্যক্রম আরো বেগবান করতেই হবে। আমাদের অর্থনীতিতে নানা পালাবদল ঘটেছে গত কয়েক দশকে। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির দাপট আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। এখন শিল্প ও সেবাভিত্তিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে আমাদের অর্থনীতি নতুন ঠিকানা খুঁজছে। কিন্তু দেশের খাদ্যের চাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় কৃষিজমির ব্যবস্থা না করে শিল্প ও সেবাভিত্তিক অর্থনীতি টেকসই হবে না। এটা সবাইকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে। বর্তমানে উন্নত কৃষি প্রযুক্তি ও আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণের কারণে খাদ্য উত্পাদন আগের তুলনায় বেড়েছে বটে। বর্তমানে বাংলাদেশে খাদ্যের কোনো সংকট নেই। তবে এ অবস্থা একটানা দীর্ঘদিন বজায় থাকবে বলে মনে হয় না। ক্রমাগত কৃষিজমি ব্যবহারের কারণে একসময় জমির উত্পাদনক্ষমতা হ্রাস পায়—এ কথা সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে। উত্পাদনক্ষমতা কমে যাওয়ার পর আমাদের কৃষি উত্পাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

স্বাধীনতার প্রথম দশকে দেশের মোট জনশক্তির ৭৫ শতাংশ কৃষি খাতে নিয়োজিত ছিল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৮ সালের তথ্য মোতাবেক কৃষিতে নিয়োজিত জনশক্তি ৪০ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এলেও স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত জনসংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় শ্রমশক্তির সংখ্যা সাকল্যে কমেনি। সম্প্রতি প্রকাশিত কৃষিশুমারি ২০১৯-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট পরিবারের ৪৬ দশমিক ৬১ শতাংশ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে ৫৩ দশমিক ৮২ শতাংশ গ্রামে, ১০ দশমিক ৪৬ শতাংশ শহরে বাস করে। এ থেকে বোঝা যায় কৃষি আমাদের জীবন ও অর্থনীতিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কৃষির ওপর নির্ভরশীলতা মানে জমির ওপর নির্ভরশীলতা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে হলেও সত্য, দেশের জনসংখ্যা যখন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন হ্রাস পাচ্ছে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ।

এটা ঠিক যে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে শিল্পায়নের গুরুত্ব অপরিসীম। কৃষি খাতের তুলনায় জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান দ্বিগুণেরও বেশি। শিল্পায়নের মাধ্যমে আমরা পাচ্ছি আধুনিক জীবনের অপরিহার্য উপকরণগুলো। তবে সেই সঙ্গে এটাও ঠিক যে কৃষি খাত আমাদের মৌলিক চাহিদা খাদ্যের জোগান দেয়। কৃষক ও কৃষি খাতের অবদানে আজ আমরা আমাদের প্রধান খাদ্য চাল, শাক-সবজি এবং আমিষের প্রধান উত্স মাছে স্বনির্ভরতা অর্জনের দোরগোড়ায় পৌঁছেছি। মাছ ও মত্স্যজাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বাংলাদেশ মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। আমরা যেসব খাদ্যদ্রব্য যেমন—গম, মাংস, ডাল, ভোজ্যতেল, দুধ, ফলমূল, মসলা চাহিদা মোতাবেক জোগান দিতে পারছি না। সেসব পণ্য অধিক পরিমাণে উত্পাদনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কৃষক ও সরকার। শিল্প খাতের কাঁচামাল সরবরাহে ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধিতে মূল্যবান অবদান রেখে আসছে কৃষি খাত।

আমাদের বাংলাদেশে উত্পাদিত অনেক কৃষিপণ্য, শাক-সবজি, ফলমূল আন্তর্জাতিক বাজারে বেশ চাহিদাসম্পন্ন। তেমন কৃষিপণ্যের ব্র্যান্ডিং করার মাধ্যমে অর্থনীতিতে নতুন দিগন্তের উন্মোচন সম্ভব। বাংলাদেশে কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ ও ব্র্যান্ডিংয়ের উদ্দেশ্য নিয়ে এগিয়ে আসা করপোরেট হাউজগুলোকে কৃষকের কল্যাণ, দেশের কল্যাণ, প্রতিষ্ঠানের কল্যাণ ও স্বার্থকে সমানভাবে বিবেচনা করতে হবে। আজ এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে কৃষিতে আমাদের অর্জন যতটা, তার অনেকটাই মৌলিক। আমাদের দারিদ্র্য বিমোচনে যে সাফল্য এসেছে, তা কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমেই এসেছে। কৃষির উন্নয়নে গুরুত্বারোপ কিংবা অন্য যে কোনোভাবেই হোক না কেন, তা দারিদ্র্য দূরীকরণে সরাসরি ভূমিকা রেখেছে। কৃষিক্ষেত্রে যতটা অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে, তা আরো এগিয়ে নিতে হলে কৃষি প্রযুক্তিতে আরো নতুন এবং অধিক উত্পাদনে সক্ষম কলাকৌশল প্রয়োগ করতে হবে। এর মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতি ভিন্ন উচ্চতায় পৌঁছে যাবে সন্দেহ নেই। এটা অর্থনীতিতে নতুন গতি এনে দিতে পারে।

n লেখক :ব্যাংকার