করোনা আতঙ্কের মধ্যেও ফসলের মাঠে ব্যস্ত কৃষক

পেঁয়াজ-গম উঠছে, সবজি চাষেরও মৌসুম এটি

মো. লুত্ফুর রহমান, কুমিল্লা প্রতিনিধি

দেশ জুড়ে এখন চলছে করোনা ভাইরাস নামক মরণদূতের আতঙ্ক। অপরদিকে এখন ফসলের মাঠ থেকে পেঁয়াজ ও গম ঘরে তোলার মৌসুম। এছাড়া বোরো ধান পরিচর্যাসহ ঢ্যাঁড়স, চিচিঙ্গা ও নানা সবজি চাষেরও মৌসুম এটি। তাই মেঘ-বৃষ্টির ঘনঘটা আর করোনা ভাইরাস আতঙ্কের মাঝেই কুমিল্লার বিভিন্ন উপজেলা এলাকায় কৃষকরা খেত-খামারের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। গ্রামীণ এলাকার কৃষকরা বলছেন, করোনার আতঙ্ক নিয়ে বসে থাকলে ফসল তো আর ঘরে উঠবে না। জেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে ও কৃষকসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে এসব বিষয় জানা গেছে।

জানা যায়, জেলার বরুড়া উপজেলার ঝলম এলাকায় ফসলের মাঠে কৃষকরা পরিবারের সদস্য ও শ্রমিক সঙ্গে নিয়ে আবাদি জমি থেকে পেঁয়াজ, রসুনসহ মৌসুমী সবজি তুলছেন। গম ও বোরো ধানের জমিতেও দল বেঁধে পরিচর্যার কাজ করছেন কৃষি শ্রমিকরা। কোনো কোনো জমিতে পাঁচ থেকে আট জন শ্রমিক এক সঙ্গে মাস্ক কিংবা গ্লাভস ছাড়াই কাজ করছেন। সকাল ও দুপুরে ফসলের মাঠে সাবান ছাড়াই হাত ধুয়ে তারা খাওয়া-দাওয়া সারছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার ১৭টি উপজেলার কম-বেশি সব মাঠেই এখন দেখা যাচ্ছে একই চিত্র। বরুড়ার ঝলম গ্রামের কৃষক ফরিদ উদ্দিন ও আবদুল আজিজ জানান, পেঁয়াজ ও রসুন সংগ্রহের এটাই সময়। বর্তমানে বাজারে দর ভালো। বৃষ্টি হলে এগুলো ঘরে রাখা যাবে না এবং দামও তেমন পাওয়া যাবে না। জেলার চান্দিনা উপজেলার দোল্লাই নোয়াবপুর ইউনিয়নের বিচুন্দাইর এলাকায় দেখা গেছে, প্রখর রোদে কৃষকরা ঢ্যাঁড়স আর চিচিঙ্গার জমিতে কাজ করছেন। একটি জমির বর্গা চাষি তাজু মিয়া (৫৫) জানান, চার জন শ্রমিক আর তিন জন পরিবারের সদস্য নিয়ে জমিতে কাজ করছেন। তাদের কারোরই মাস্ক কিংবা করোনা সতর্কতামূলক কিছুই নেই। শ্রমিক মনু মিয়া (৬০) ও মতিন মিয়া (৫৫) জানান, ‘ভাইরাসের কথা হুনছি (শুনেছি)। আমরা গরিব মানুষ, মরণের ভয়ে ঘরে থাকলে খাব কি। ভোট দিয়া আমরা নেতা বানাই, এখন কেউ খোঁজ নেয় না।’ একই মাঠে সপরিবারে কাজে ব্যস্ত কৃষক মনিরুল ইসলাম জানান, ‘করোনার ভয়ে বসে থাকলে ফসল কি আর ঘরে উঠবে? বৃষ্টি হলে সব শেষ হয়ে যাবে।’ ঐ এলাকার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নজরুল ইসলাম (৬৮) জানান, ‘এ সময়ে কুমিল্লার সব উপজেলাতেই কম-বেশি রবিশস্য উত্পাদন হয়। কৃষকের ব্যস্ত সময়ে এবার দেশে করোনার মতো ভয়াবহ ভাইরাস দেখা দিয়েছে। এর ফলে কৃষকরা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে পারছেন না। তারা ভাইরাসজনিত ঝুঁকিতে রয়েছেন।’ চান্দিনার মাইজখার ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির বাবুল বলেন, ‘করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ছুটি ঘোষণা করেছে। কিন্তু গ্রামীণ এলাকায় নিম্ন আয়ের পরিবারের ছাত্ররা কৃষি কাজে তাদের বাবা-ভাইকে সাহায্য করছে। তাদের মাঝে সচেতনতা আছে বলে মনে হয় না। তবে সরকারের সদিচ্ছা বাস্তবায়নে গ্রামীণ এলাকায় ব্যাপক প্রচারণার প্রয়োজন।’ দোল্লাই নোয়াবপুর ইউপি চেয়ারম্যান শাহাব উদ্দিন মাস্টার জানান, ‘আমরা সচেতনতামূলক নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি, কিন্তু চাষিরা তাদের মৌসুমী ফসল উত্পাদন ও বিপণনে লোকসানের ভয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।’ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সুরজিত চন্দ্র দত্ত জানান, ‘করোনা বিষয়ে সচেতনতার জন্য মাঠপর্যায়ে কৃষক ও শ্রমিকদের মাঝে লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে করোনার বিষয়ে ধারণা দিচ্ছেন। সচেতনতার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বিষয়টি আমি মনিটর করছি।’