দেশে করোনা সংক্রমণের পর থেকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে চিকিত্সকরা রোগীদের সঙ্গে নির্দয় আচরণ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। করোনা ভাইরাসের উপসর্গের সঙ্গে সামান্য মিল পেলেই রোগী ভর্তি অথবা চিকিত্সা সেবা দিতে অনীহা প্রকাশ করছেন ডাক্তাররা। অর্থাত্ কোনো কারণে সর্দি, জ্বর, হাঁচি, কাশি, গলাব্যথা থাকলে অন্য কোনো রোগের চিকিত্সা করাতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন রোগীরা। এ কারণে ক্যান্সার, কিডনি ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ৪ কোটি ৩১ লাখ রোগী চরম বিপাকে পড়েছেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ সোসাইটি অব রেডিয়েশন অনকোলজিস্টের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. শেখ গোলাম মোস্তফা বলেন, আমি ডাক্তার, যেকোন পরিস্থিতিতে রোগীর সেবা দেবো। সেবা না দেওয়া অমানবিক। তিনি বলেন, করোনা ভাইরাস মুখ দিয়ে শ্বাসনালিতে প্রবেশ করে। তাই মাস্ক ব্যবহার করলেই যথেষ্ট। ডাক্তার- রোগী উভয়কেই মাস্ক পড়তে হবে। তারপর যদি কারো করোনা আক্রান্ত সন্দেহ হয় তাহলে তাকে আলাদা কর্নারে রেখে আইইডিসিআরকে খবর দিতে হবে। নমুনা পরীক্ষায় করোনা ধরা পড়লে আদালাভাবে তার চিকিত্সা চলবে। কিন্তু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে রোগীর সেবা দেবো না, তাহলে ডাক্তার হইছি কেন? কোন রোগীর সেবা না দেওয়া খুবই অন্যায়। অবশ্যই রোগীর সেবা দিতে হবে। তিনি নিয়মিত হাসপাতাল ও প্রাইভেট চেম্বারে রোগীদের চিকিত্সা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান।
বিএসএমএমইউয়ের সাবেক ভিসি ও প্রখ্যাত ইএনটি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহও নিয়মিত নিজস্ব নিরাপত্তা নিয়েই প্রাইভেট চেম্বার ও হাসপাতালে চিকিত্সা সেবা দিয়ে আসছেন। তারা বলেন, আমরা চিকিত্সক। আমার নিরাপত্তা ঠিক রেখেই সেবা দেবো। সেবা না দিয়ে ঘরে বসে থাকা রোগীদের সঙ্গে মুনাফিকি করা। বিশ্বে করোনা রোগীদের চিকিত্সা সেবা দিতে গিয়ে অনেক ডাক্তার প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু চিকিত্সা সেবা বন্ধ করেননি। বীরদর্পে তারা দিনরাত চিকিত্সা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। যা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ফলাও করে প্রকাশিত হচ্ছে। সম্প্রতি দেশে বিনা চিকিত্সায় বেশ কয়েকজন রোগী মারা যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া অনেক রোগী হাসপাতালে গিয়ে চিকিত্সা না পাওয়ার কথা বলেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের কল্যাণে এসব তথ্য এখন আর অজানা থাকছে না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, স্বাভাবিক সময়ে যেসব হাসপাতাল ও ক্লিনিক রোগীতে ঠাসা থাকত সেগুলো এখন প্রায় রোগীশূন্য। করোনা ছাড়া বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে যারা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, চিকিত্সাসেবা না পেয়ে তারাও হাসপাতাল ছাড়ছেন। এমনকি অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক বন্ধ রেখেছেন ‘প্রাইভেট চেম্বারে’ রোগী দেখাও। অনেক সরকারি হাসপাতালের পরিচালকসহ বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা ঘরে বসে আছেন। তবে এই পরিস্থিতিতে কিডনি ফাউন্ডেশনে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। সেখানে নিয়মিত রোগীদের চিকিত্সা সেবা দেওয়া হচ্ছে।
ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও প্রখ্যাত কিডনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হারুন-অর-রশীদ বলেন, বাংলাদেশে প্রায় আড়াই থেকে তিন কোটি মানুষ কিডনি সমস্যায় আক্রান্ত। প্রতি বছর ৪০ হাজার রোগীর কিডনি ফেইলর হয়ে থাকে। প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার মানুষ কিডনিজনিত সমস্যায় মারা যায়। তিনি বলেন, ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের মধ্যে ১১ ভাগ মানুষ কিডনি সমস্যায় আক্রান্ত। দেশে উচ্চ রক্তচাপের রোগী আছেন তিন কোটি। এসব রোগীদেরও কিডনি সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বেশি। তিনি আরও বলেন, ডায়াবেটিস, কিডনি ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের করোনার ঝুঁকি বেশি থাকে। কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। ইতালিতে সম্প্রতি এ ধরনের রোগীদের ওপর এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। তাই এই তিন ধরনের রোগীদের কোন ধরনের উপসর্গ ছাড়াই করোনা পরীক্ষা করতে হবে। ডা. হারুন-অর-রশীদ জানান, বাংলাদেশ কিডনি ফাউন্ডেশনের আউটডোর খোলা আছে। প্রতিদিন ইনডোরে ১৮০ জনের কিডনি ডায়ালাইসিস করতে হচ্ছে। চার মাস আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনা নিয়ে বাংলাদেশ চরম ঝুঁকিতে রয়েছে-এই তথ্য জানানোর পরপরই পিপিই প্রস্তুত করে রেখেছি। তারপরও যদি কোন বিশেষজ্ঞ না আসেন, তাহলে স্কাইপের মাধ্যমে রোগীর সেবা দেওয়া হয়। ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে রোগীর সঙ্গে কথাও বলা হচ্ছে। কোন রোগীকে সেবার বাইরে রাখা হচ্ছে না বলে তিনি জানান।
ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিক ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ৮৪ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। তবে দেশের ডায়াবেটিক সমিতির জরিপ অনুযায়ী এই সংখ্যা দ্বিগুন। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি জরিপ অনুযায়ী, এক হাজারের মধ্যে ৮ জন মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। সেই হিসেবে ১৬ কোটি মানুষের দেশে ১ কোটি ২৮ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। অর্থাত্ ঘরে ঘরে ডায়াবেটিসের রোগী। প্রতি বছর দ্বিগুন হারে ডায়াবেটিসের রোগী বাড়ছে। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির পরিচালক ফরিদ কবির বলেন, ‘পিপিই সংকট বলে এক শ্রেণির ডাক্তার সেবা দিতে আসছেন না। বিশেষ করে সিনিয়র ডাক্তাররা কম আসেন। জুনিয়র ডাক্তার দিয়ে সেবা চলছে। এতে সেবা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।’
জানা গেছে, দেশে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত। প্রতি বছর ৫০ থেকে ৬০ হাজার মানুষ ক্যান্সারে মারা যায়। নতুন করে প্রায় একই হারে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। বর্তমানে ক্যান্সার রোগীরাও তাদের চিকিত্সা নিয়ে পড়েছেন চরম বিপাকে। ডাক্তারদের নির্দয় আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে অনেক রোগী এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছোটাছুটি করতে করতেই প্রাণ হারাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেন, প্রতি বছর এই সময়ে অনেকের জ্বর, সর্দি, কাশি, গলায় ব্যথা হয়। অপারেশনের রোগী কিংবা ক্যান্সার, ডায়াবেটিস ও কিডনি সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদেরও জ্বর, সর্দি, কাশি হতে পারে। তাই বলে তাকে সেবা না দেওয়া অমানবিক। এ ব্যাপারে সরকারিভাবে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নইলে অনেক রোগী বিনা চিকিত্সায় মারা যাবে। বিশেষ করে যারা ডায়ালাইসিসের রোগী তাদের জীবনহানির আশঙ্কা আরো বেশি থাকে। বিশেষজ্ঞদের আরো অভিমত, বর্তমান সময়ে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে তার চেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে চিকিত্সা না পেয়ে।
বেসরকারি হাসপাতালের মালিক পক্ষ বলছেন, বেশিরভাগ ডাক্তার নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে বাসায় বসে আছেন। তারা চেম্বারে আসেন না। এ অবস্থা চলতে পারে না। রোগীদের জীবন রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সরকারকে এ বিষয়টি দ্রুত হস্তক্ষেপ করা উচিত। অন্যথায় চিকিত্সা না পেলে প্রতিদিন অনেক রোগী মারা যাবে।
বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা বলেন, সরকার যে ধরনের পিপিই দিয়েছে একটা করে, এই পিপিই একদিন ব্যবহার করার পর জীবাণুমুক্ত করার কোন সুযোগ নেই। তাই অনেকে পিপিই পেয়েও করোনা ঝুঁকির কারণে রোগী দেখতে আসছেন না। চিকিত্সক, নার্সসহ স্বাস্থ্য সেবা কর্মীদের প্রত্যেককে অন্তত তিনটি করে পিপিই দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।