মধুপুর বনাঞ্চলের চাঁদপুর বিট

‘ইট-পাথরের ফলক প্রমাণ দেয় একদা এখানে বন ছিল’

গোপালপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা

ধরাটি বাজার থেকে সর্পিল কাঁচা সড়ক পীরগাছা রাবার বাগান হয়ে দোখলা পিকনিক স্পটে মিশেছে। এ সড়কে ১০০ গজ আগালেই হাতের ডানে ইট-সিমেন্টের খুঁটিতে বড়োসড়ো ফলক। তাতে লেখা, ফরেস্ট্রি সেক্টর প্রকল্প, চাঁদপুর বিট, কৃষি বন বাগান, ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ। ধরাটির বাসিন্দা কার্ত্তিক দালবত্ জানান, টাঙ্গাইল বন বিভাগের দোখলা রেঞ্জের চাঁদপুর বিটের বনকর্মীরা ৯০ সালে ধরাটি, কোনাবাড়ী, আঙ্গারিয়া, ফুলবাগচালা, গেন্দারচালা, রাঘামারিসহ পাহাড়ি এলাকায় যে বনায়ন করে এটি তারই স্মারক। বনায়নের গাছপালা কবে সাবাড় হয়ে গেছে। প্রভাবশালীরা তাতে কলাসহ নানা ফলমূল ও সবজি আবাদ করছে। আর খেতের আইলে এসব স্মারক নীরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

কুড়াগাছা ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার আবুল হোসেন জানান, বন বিভাগ নিম্নমানের অজুহাতে প্রথমে গজারিবন পুড়িয়ে সাবাড় করে। পরে সেই পতিত জমিতে ফরেস্ট্রি সেক্টর প্রকল্পের মাধ্যমে বিদেশি প্রজাতির বৃক্ষে উডলট ও এগ্রোফরেস্ট্রি মডেলের বাগান করে। দোখলা রেঞ্জ অফিসার আব্দুল আহাদ জানান, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে এ বনায়ন করা হয়। কিন্তু বন অপরাধীরা সব গাছ পাচারের পর পতিত বনভূমিও বেদখলে চলে যায়। দোখলা রেঞ্জ অফিস সূত্রে জানা যায়, এ রেঞ্জের চাঁদপুর বিটে বনভূমির পরিমাণ ৪ হাজার ৬৬৩ একর। এর পুরোটাই এখন জবরদখলে। গেদারচালা গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক আব্দুল হাকিম জানান, গজারিবন পুড়িয়ে তাতে বিদেশি গাছের চারায় বনায়ন ছিল ভুল কাজ। আর অংশীদারদের সহযোগিতা না পাওয়ায় বাগানের গাছ যেমন রক্ষা করা যায়নি, তেমনি গাছ লোপাটের পর পতিত বনভূমি জবরদখলে নেপথ্যে বনকর্মীদের ভূমিকা ছিল। কুড়াগাছা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফজলুল হক জানান, বাংলাদেশের বনাঞ্চলে কোথাও এমন কুনজির নেই যে, একটি বিটের পুরো বনভূমিই জবরদখলে গেছে। চাঁদপুর বিটের সাড়ে ৪ হাজার একর বনভূমির পুরোটাই বেদখলে যাবার পর সেখানে কলা আর আনারস আবাদ করছে বহিরাগত প্রভাবশালীরা। তিনি দুঃখ করে বলেন, ‘এখন শুধু চাঁদপুর বিট অফিস আর বিস্তীর্ণ কলাবাগানের ফাঁঁকে ফাঁকে কিছু ফলক ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

এসব স্মারক প্রমাণ করছে যে একদা এখানে বন ছিল।’ চাঁদপুর বিট অফিসার জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, এলাকাটি বন অপরাধীদের অভয়ারণ্য। জবরদখল মুক্ত করে এখানে পুনঃবনায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। দোখলা রেঞ্জ অফিসার আব্দুল আহাদ জানান, ২০০৭ সালের দিকে সেনাবাহিনীর সহায়তায় ২৫০ একর বনভূমি দখলমুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু প্রভাবশালীদের তাণ্ডবে তা ধরে রাখা যায়নি। এ অর্থবছরে ৫০০ একর বনভূমি পুনরুদ্ধার করে তাতে বনায়নের কাজ চলছে। মধুপুর বনাঞ্চলের সহকারী বন সংরক্ষক জামাল হোসেন তালুকদার জানান, অভিযান চালিয়ে এরই মধ্যে ২০ একর কলাবাগান উচ্ছেদ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এ অভিযান চলবে।