করোনার শিক্ষা যেন না ভুলি

হেনা সুলতানা

বিশ্বের এমন কোনো প্রান্ত নেই যেখানে করোনার ভয় পৌঁছায়নি। উন্নত প্রযুক্তির কল্যাণে ইতোমধ্যেই করোনার ক্ষতির সক্ষমতা, মৃত্যুর হার, ছড়ানোর মাধ্যম সম্পর্কে কম-বেশি সকলেই জেনে গেছেন। ছোঁয়াচে এ রোগের কোনো প্রতিষেধক নেই, কেবল সচেতনতাই সম্বল।

ওদিকে লাখ লাখ মানুষ দেশে ফিরেছে আক্রান্ত দেশগুলো থেকে। নানা আলোচনা-সমালোচনায় গড্ডালিকা প্রবাহে বাধা পড়ল শেষ পর্যন্ত ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি ছুটি ঘোষণায়। সেটা এরপর পরিবর্ধিত হলো ১১ এপ্রিল পর্যন্ত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটি দেওয়া হয়েছিল আগেই। শহর ছেড়েছে মানুষ। এক দিকে স্বস্তি অন্য দিকে আতঙ্ক। শহর থেকে গ্রামে ছোটা মানুষগুলো করোনা নিয়ে যাচ্ছে না তো? এ অবস্থায় সহজেই আঁচ করা যায় যে আমরা কতটা বিপদের মুখে পড়ে আছি। দেশ-বিদেশের প্রতি মুহূর্তের খবর মানসিকভাবে আমাদের অস্থির করে তুলছে স্বেচ্ছা কোয়ারেন্টাইনে থাকা অবস্থায়।

টেলিভিশনের পর্দায় পাখির চোখে ঢাকার দৃশ্য দেখে ভীষণ অবাক হলাম। এমন দৃশ্য কে কবে দেখেছে? ঈদের ছুটিতেও ঢাকা ফাঁকা হয়ে যায় অথবা হরতাল অবরোধে রাস্তাঘাট গাড়িশূন্য হয়ে যায়, মানুষজন এখানে-সেখানে ইতিউতি ঘুরে বেড়ায়। তাই বলে এই রকম সুনসান ঢাকা কখনো দেখিনি। কী নির্জন! কী অচেনা! কী অদ্ভুত! সবাই স্বেচ্ছা নির্বাসনে আছে। কোনো কোলাহল নেই, নেই কোনো ভিড়ভাট্টা বা অকারণে চৌরাস্তার মোড়ে জটলা, নেই কোনো আড্ডাবাজি। আকাশ পথ, নৌপথ, স্থলপথ, যান চলাচল একরকম বন্ধই। বন্ধ কলকারখানা। এর নামই বোধ হয় লকডাউন। এ দৃশ্য আজ শুধু বাংলাদেশের নয়, সারাবিশ্বের। দিন-রাত মানুষ ঘরের ভেতরে আটকে আছে। কীভাবে সম্ভব? সে অন্য প্রসঙ্গ।

তবে প্রসঙ্গ হচ্ছে বাইরে জেগে উঠছে প্রকৃতি। এতদিন বন্দি ছিল। এই অল্প কিছুদিনেই সে গা ঝাড়া দিয়ে প্রাণ খুঁজে পেয়েছে। করোনার আগমনে জেগে ওঠা সম্ভব হয়েছে। কত মানুষ ছুটিতে গ্রামে গেছে সে হিসেব পাওয়া মুশকিল তবে মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে একটি পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে, করোনা মোকাবিলায় সরকারের ছুটি ঘোষণার পর ১ কোটি ৩০ লাখ মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী ঢাকা ছেড়েছে। আন্দাজ করা যায় সব মিলিয়ে সংখ্যাটা আরো বেশি হবে। এর ফলাফল দাঁড়িয়েছে ২২ মার্চ থেকে রাজধানীর আবহাওয়া সুস্থ হতে শুরু করেছে। এ তথ্য দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক বিশ্বের বায়ুমান যাচাই বিষয়ক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘এয়ার ভিজুয়াল’। তাদের মতে, বায়ুমান সূচক ৩০০-এর ওপরে গেলে তাকে দুর্যোগ অবস্থা বলে। ঐ দিনের পর থেকে সূচক নেমে হয়েছে মাত্র ৮৫। তার আগে গত ছয় মাস দিনের বেশির ভাগ সময় ঢাকা শহরই ছিল প্রথম স্থানে। সর্বশেষ সূচক ৩৯১ পর্যন্ত উঠেছিল। বর্তমান অবস্থা যে সত্যিই ভালো তা বুঝবার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। চারদিকের পরিবেশ দেখে সহজেই অনুমান করা যায়।

এমন ঝকঝকে ঢাকার বিপরীতে কদিন আগেও রাস্তাঘাটে, অলিতেগলিতে, ড্রেনে, ডাস্টবিন উপচে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকতে দেখা যেত। ধুলোবালি, কালো ধোঁয়ার গন্ধে পেটের নাড়িভুঁড়ি উঠে আসতে চায়। নাকে শক্ত করে রুমাল চেপেও সে গন্ধ থেকে রেহাই পাওয়া যায় না। আহা করোনার জাদুতে এখন সব ঝকঝক করছে।

চৈত্রের মাঝামাঝি। বসন্ত হাওয়ায় চারদিক মৌ মৌ করছে। ঢাকা শহরের আইল্যান্ডের গাছগুলো প্রাণ ফিরে পেয়েছে। পাতাঝরা গাছগুলোতে নতুন পাতা গজিয়ে উঠছে। পার্কে সবুজ ছিল কিন্তু প্রাণ ছিল না। সেখানে এখন প্রাণ ফিরে এসেছে। সেখানে কোকিল, শ্যামা, দোয়েলরা কলতানে নির্ভয়ে আসর জমিয়েছে। নির্মল বাতাসে ফুরফুর করছে ঢাকার এ প্রান্ত থেকে সে প্রান্ত। শিমুল, পলাশ, অশোকের বনে যে বাতাস বইছে সেখানে কিছু দীর্ঘশ্বাস নিশ্চয়ই হাহাকার করে ফিরছে। দেখার কেউ নেই। প্রাণ ভরে কবিতা লিখবার জন্যে এক জন কবিও আজ ঘরের বাইরে নেই। করোনার প্রভাব যে শুধু স্থলভাগেই পড়েছে তা নয়। খবরে দেখতে পাচ্ছি জলভাগেও পরিবর্তন এসেছে। কক্সবাজার, আমাদের সাগর পাড় সেখানেও দেখতে পাচ্ছি খেলতে আসছে শান্তিপ্রিয় ডলফিনের দল। আমাদের আশপাশে ডলফিন ছিল তা-ই তো জানা ছিল না! আমাদের নদী-নালা, খাল-বিলগুলোর দিকে তাকালে বড়ো মায়া লাগে। যেন কেউ নেই ওদের। সর্বগ্রাসী মানুষ আজ ঘরবন্দি তাই সাহস করে বেরিয়েছে বনের পশু-পাখিও। আসলে স্বার্থপর মানুষ ভুলে যায় এ পৃথিবী সবার জন্য। এ দিনগুলোর কথা কি মনে রাখবে মানুষ?

সে কি শিক্ষা নেবে এখান থেকে যে—সবাইকে নিয়েই বাঁচতে হবে?

n লেখক : শিক্ষক, ভারতেশ্বরী হোমস