আমরা কি শেষ বিচারের সম্মুখীন?

দশ দিগন্তে g আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

্রএতকাল ভেবেছি দীর্ঘ জীবন লাভ দীর্ঘ অভিশাপ। এত দীর্ঘ জীবন লাভ না করলে এত ভাইবোন, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন হারানোর শোকসন্তাপ বুকে ধারণ করতে হতো না। ৯০ বছরের কাছাকাছি পৌঁছে চারদিকে তাকিয়ে দেখছি, আমার আবাল্য পরিচিত বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, যাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল, যাদের সঙ্গে ঝগড়া করেছি, কলমযুদ্ধ করেছি—তারা কেউ নেই। এখন কলমযুদ্ধে নামতে হলে শিং ভেঙে বাছুরের দলে যোগ দিতে হবে। তাই বাধ্য না হলে কলমযুদ্ধে নামি না।

এতদিন ভেবেছি, রোগশোক সন্তাপময় এত দীর্ঘজীবন লাভ আমার ঠিক হয়নি। আমার বন্ধুরা এই শোকদুঃখ সন্তাপ ভোগ করা থেকে আগেই মুক্তি পেয়েছেন; কিন্তু এখন বিশ্বময় এই করোনা ভাইরাস দেখা দেওয়ার পর ভাবছি, দীর্ঘকাল বেঁচে থাকাটা অর্থময় হয়েছে। আমার বন্ধুরা রোজ কেয়ামতের কথা জানতেন; কিন্তু তা দেখে যাননি। আমিও ভাবতাম কেয়ামত এত দূরে রয়েছে, আমি কেন, আমার পরবর্তী ১০ পুরুষও তা দেখে যাবে না; কিন্তু আমাদের অনুমান ভুল প্রমাণিত হয়েছে। করোনা ভাইরাস নামে যে বিশ্বধ্বংসী অদৃশ্য দানব আকস্মিকভাবে নেমে এসেছে তাকে রোজ কেয়ামত ছাড়া কী বলব?

আমরা এখন আতঙ্কের মধ্যে বাস করছি বটে; কিন্তু ডে অব রেশারেকসনের দিন আমরা যেদিন পুনরুজ্জীবিত হব সেদিন আমার বর্তমানে মৃত বন্ধুরা লজ্জায় মাথা হেট করবেন। কারণ তারা আমাদের মতো রোজ কিয়ামত দেখে যাননি। তারা ঝড়-বন্যা, প্লেগ, কলেরা, বসন্তের আঞ্চলিক মহামারি দেখে গেছেন, যে মহামারি শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা ও বড়ো ধনীদের তেমন ছোঁয়নি। বাংলা ১৩৫০ সালে দুর্ভিক্ষ ও মন্বন্তরে ৫০ লাখ লোক মরেছে; কিন্তু তত্কালীন শীর্ষনেতা ফজলুল হক, নাজিমুদ্দীন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বিধান রায়, জ্যোতি বসুদের একজনও না খেয়ে ছিলেন কি? অনাহারে কেউ মরেছেন কি?

না, এদের কেউ মরেননি। ১৯৬৯ সালের নভেম্বর মাসে এত বড়ো নাকি জলোচ্ছ্বাস হলো তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলবর্তী জেলাগুলোত। তাতে এক রাতে ১০ লাখ নর-নারী-শিশু মারা গেল; কিন্তু একজনও শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা কিংবা শীর্ষ ব্যবসায়ী মারা গেলেন কি? না যাননি। তাহলে কি বর্তমান করোনা ভাইরাসকে কমিউনিস্ট ভাইরাস বলা চলে না? কমিউনিস্ট চীন থেকে তার উত্পত্তি। সারা দুনিয়ায় তার বিস্তার ঘটেছে। ব্রিটেনের যুবরাজ, প্রধানমন্ত্রী থেকে নারায়ণগঞ্জের এক সাধারণ গৃহবধূ—কেউ এই হামলা থেকে রেহাই পাননি।

সব মানুষের আচার-আচরণেও করোনা সমতা এনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর, কংগ্রসম্যান থেকে রাস্তার কুলি-মজুর পর্যন্ত মুখে মাস্ক পরেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় বাংলাদেশের মন্ত্রিসভার বৈঠকের ছবি দেখলাম। প্রধানমন্ত্রী থেকে সব মন্ত্রীর মুখে মাস্ক, নারায়ণগঞ্জের করোনা আক্রান্ত সাধারণ গৃহবধূটির অবস্থা ভালো নয়। এদিকে আজকের লন্ডনের খবরে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন হাই টেম্পারাছে ভুগছেন। চীনে যে বিপুল জনসংখ্যা করোনায় মারা গেছে, তাদের জন্য জাতীয় শোক দিবস পালনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। শিগিগরই হয়তো জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক শোক দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেবে।

পাকিস্তানের এক আলেম সাহেব ফতোয়া দিয়েছেন, করোনার এই হামলা রোজ কেয়ামত না হলেও রোজ কেয়ামতের আলামত। তিনি দর্প প্রকাশ করে বলেছেন, বিজ্ঞান, না ধর্ম—কার শক্তি বেশি প্রমাণিত হলো? বিজ্ঞান গত ২ হাজার বছর ধরে যা কিছু আবিষ্কার করেছে, বিদ্যুত্ থেকে মহাশূন্যযান, ইনজেকশন থেকে লাইফ সাপোর্টিং সিস্টেম—সব কিছু এক লহমায় ব্যর্থ হয়ে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে প্লেন, ট্রেন, টিউব—সবকিছু। প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষ যা আবিষ্কার করেছে গত ২ হাজার বছর ধরে, প্রকৃতি বা করোনা তার সব কিছু অচল করে দিয়েছে এক আঘাতে।

আলেম সাহেব দর্পের সঙ্গে আরো বলেছেন, বিজ্ঞানের নয়, ধর্মের আরো একটি কথা সত্য হয়েছে। ধর্ম বলেছে, রোজ কেয়ামতের দিন মানুষ পরিবার-পরিজন, স্ত্রী-পুত্র সবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হবে। ভয়ে একে অন্যের খবর নেবে না। শুধু বলবে ইয়া নাফসি, ইয়া নাফসি। অর্থ আমাকে বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও।

বর্তমানে একথাই সত্য হয়েছে। প্রত্যেকটি মানুষ নিজেকে অন্যের কাছ থেকে আইসোলেটেড করেছে। স্ত্রী স্বামীর সান্নিধ্যে যাচ্ছে না, পুত্র পিতার সান্নিধ্যে যাচ্ছে না। সবার মুখে এক কথা—আমাকে বাঁচাও। আক্রান্ত যুবরাজ, প্রধানমন্ত্রী যেমন আইসোলেশনে গেছেন, হাঙ্গেরির দরিদ্র মজুরও সেই আইসোলেশনে গেছেন।

এক আলেম সাহেবের করোনা ও কেয়ামতের মধ্যে তুলনা হেসে উড়িয়ে দিচ্ছি না। বিজ্ঞানীরাও স্বীকার করেছেন, এই ক্রাইসিসের পর যে নতুন বিশ্ব গড়ে উঠবে, তাতে টেকনোলজির ওপর মনুিষের ক্রমাগত বর্ধিত নির্ভরতা অনেক কমবে; কিন্তু এই আলেম সাহেব যেখানে বলছেন, রোজ কেয়ামতের পর বিশ্ব ও মানব সভ্যতা একেবারে ধ্বংস হয়ে যাবে। হাশরের ময়দানে পাপ-পূণ্যের বিচারের পর মানুষের একদল স্বর্গে যাবে, অপর দল যাবে নরকে, সেখানে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ধ্বংসের পরও আরেকটি নতুন বিশ্ব গড়ে উঠবে। মানব সভ্যতা নতুন চেহারায় জেগে উঠবে।

কিন্তু সেই চেহারাটা কী হবে? সম্প্রতি লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকা এই ব্যাপরে একটি সমীক্ষা চালিয়েছে। ‘Aster the virus, will it be all change—or just back to buisness as usual? (এ ভারাইরাসের পর সব কিছুই কি বদলে যাবে? না বিশ্ব আগে যেমন চলছিল, তেমনই চলবে?) সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিশেষজ্ঞেরা ভাবছেন, বিশ্বে একটা ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। তবে হঠাত্ করে সব কিছুই একেবারে পালটে যাবে না। ট্রেড ইউনিয়ন সংগ্রেসের (ব্রিটিশ) জেনারেল সেক্রেটারি বলেছেন, বর্তমানে আমরা কোভিড-১৯-এর সঙ্গে যুদ্ধে ব্যস্ত। তার পর আসবে বিশ্বময় মহামন্দা বা গ্রেট ডি প্রেসন।

জেনারেল সেক্রেটারি বলেছেন, এই দুই সংকটের মহাধাক্কা সামলানোর পর বিধ্বস্ত বিশ্বে মানব সভ্যতা বেঁচে থাকবে; কিন্তু এই ধাক্কায় মানব চরিত্র ও মানব সভ্যতায় বড়ো রকমের পরিবর্তন আসবে। এই পরিবর্তন কতটা হবে তা নির্ভর করে সাধারণ মেহনতি (ordinary wrokers People) মানুষের কাজের ওপরে। খেটে খাওয়া পরিবারগুলোর কাজ এবং জীবনযাত্রার মানের ওপরেও এই পরিবর্তন নির্ভর করবে। তবে একটা ব্যাপার স্পষ্ট, আমরা আবার আগের দিনগুলোতে ফিরে যেতে পারব না।

বর্তমানের ধনবাদী সভ্যতার ইনডিভিজুয়ালিজম বা ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য, সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ এবং মুক্তবাজার অর্থনীতি প্রচণ্ড ধাক্কা খাবে। তার বদলে এই ক্রাইসিস মানুষকে কালেকটিভিজম, কমনপারপাজেম ও সোশ্যাল পার্টনারশিপ শিক্ষা দেবে। এই ক্রাইসিসের সময় মানুষ বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও একটা সমতাবোধ অনুভব করেছে। সাধারণ মানুষের কাজ ও সহানুভূতির ওপর সমাজ টিকে রয়েছে। বুড়ো মানুষদের শপিংয়ে সাহায্য করা, ওষুধপত্র এনে দেওয়া, উচ্চ-নীচ ভেদাভেদ ভুলে শিশু ও নারীদের জন্য নানা ডেলিভারি এনে দেওয়া ইত্যাদির মধ্যদিয়ে যে নতুন সামাজিক চেতনার জন্ম হয়েছে তা আগামী দিনের বিশ্বসভ্যতার মোল্ডিং বদলে দেবে।

এই বিশ্বব্যাপী ধ্বংসযজ্ঞের বা রোজ কেয়ামতের আলামতের মধ্যে বসেও তাই মনে হচ্ছে নজরুলের এই অমর বাণীটি সঠিক—‘ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর/ ধ্বংস নতুন সৃজন বেদন।’ এই সৃজন-বেদন ট্রাম্পের প্রাত্যহিক যুদ্ধের হুংকার থামিয়েছে। ইরাক, সিরিয়া, প্যালেস্টাইনে রক্তপাত বন্ধ করেছে। ভারতে মুসলিম দলন এবং পাকিস্তানে হিন্দু-বৌদ্ধ দলন প্রশমিত করেছে। কাশ্মীরে ও আফগানিস্তানে রক্তপাতের কথা শোনা যাচ্ছে না। বড়ো দানব আসায় ছোটো দানবগুলো নিষ্ক্রিয়।

মানব সভ্যতার জন্য এটা একটা টার্নিং পয়েন্ট। পরিস্থিতি এখনো ভীতিকর; কিন্তু এই ভয় ও আতঙ্ককে পরাজিত করাই হবে মানব সভ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখার একমাত্র মূলমন্ত্র। এই ভাইরাসের প্রতিষেধকও একদিন বেরোবে। চিকিত্সা বিজ্ঞানীরা অবিরাম চেষ্টা করে চলেছেন। হয়তো দেরি হবে কিন্তু আজ হোক আর কাল হোক এই প্রতিষেধক বের হবেই। গোটা বিশ্ব আজ এক ক্রান্তিকালের মধ্যদিয়ে এগোচ্ছে। কিছু মানুষের স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক মৃত্যু হবেই; কিন্তু মানবতার মৃত্যু নেই। মানব সভ্যতার ধ্বংস নেই।

n লন্ডন, ৪ এপ্রিল, শনিবার, ২০২০