করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ এবং চিকিত্সা

মেজর ডা. খোশরোজ সামাদ

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উত্কর্ষের যুগে যখন প্রকৃতির নানাবিধ খেয়ালকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সক্ষম হয়েছে তখন সাধারণভাবে প্রশ্ন আসে ভাইরাসটির বিরুদ্ধে কার্যকরী ওষুধ বা প্রতিষেধক আজও তৈরি করা গেল না কেন? এন্টিবায়োটিক শব্দটি বহুল পরিচিত। কিন্তু, এটি শুধু ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে। এছাড়া ফাঙ্গাস, প্রোটোজোয়া ইত্যাদি অণুজীবের বিরুদ্ধে যথাযথ ওষুধ থাকলেও ভাইরাসকে প্রতিহত করবার পুরোপুরি কার্যকরী ওষুধ চিকিত্সা বিজ্ঞান আজও আমাদের উপহার দিতে পারেনি। বিগত দিনে ভাইরাস ঘটিত কিছু রোগ আমাদের চৈতন্যের দ্বারে বিপুলভাবে নাড়া দিয়ে গেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় SARS, MERS, AIDS ইত্যাদির নাম। এছাড়া ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বিশেষত আফ্রিকাতে যখন ব্যাপক লোক ক্ষয় হয়েছিল তখনো ভাইরাস নামের অণুজীবের কাছে চিকিত্সা বিজ্ঞানের অসহায়ত্ব আরেকবার প্রস্ফুট হয়েছিল। উল্লিখিত ভাইরাসগুলোর ধরন পৃথক পৃথক রকম। চিকিত্সা বিজ্ঞানের জনক হিপক্রিটাসের যুগ হতে অদ্যাবধি এই ভাইরাসগুলোর প্রাদুর্ভাব এই প্রথম। ফলে চিকিত্সকদের কাছে বিষয়টি নতুন এবং সংশ্লিষ্টদের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই এই ‘মহাযুদ্ধে’ নামতে হয়েছে। করোনা ভাইরাস তার অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখবার জন্য প্রতিনিয়তই তার ‘জীন’ তথা গঠন এবং আচরণ বদলাচ্ছে। অদ্যাবধি এই ভাইরাস অন্তত ৩৮০ বার এই কাজটি সাড়ম্ব্বরে করেছে। ফলে বিজ্ঞানীদের জন্য ‘ক্ষণে ক্ষণে ‘ পরিবর্তিত ভাইরাসের প্রতিষেধক বা ওষুধ তৈরি করা জটিল হয়ে পড়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ বিস্তারের ফলে আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি যে, ২০১৯ সালে চিনের উয়ান প্রদেশে এই রোগটি প্রথম দৃষ্টিগোচর হয়। নতুন এই ব্যাধিটি নিউমোনিয়া সদৃশ্য লক্ষণ নিয়ে উপস্থাপিত হওয়ায় কিছুটা বিভ্রান্ত চিকিত্সকেরা প্রথমে এটির নাম দেন ‘নিউমোনিয়া অব আননোন অরিজিন। ‘বাংলায় তরজমা করলে তার অর্থ হয়তো ‘অজ্ঞাত কারণের নিউমোনিয়া’ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। চাইনিজ সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি ) ব্যাপক গবেষণার পর এই সিদ্ধান্তে আসে যে, এটি একটি ভাইরাসজনিত রোগ এবং করোনা ভাইরাস (Co-V) পরিবারের সদস্য । এটি আর এন এ তথা রাইবোজোমাল নিউক্লিক এসিড ভাইরাস। অন্যান্য ভাইরাসের থেকে এটির বিশেষত্ব হলো এর গঠনে তীক্ষ্ন অগ্রভাগ সদৃশ গজাল আছে, যাকে স্পাইক বলা হয়। স্পাইকগুলোর কারণে ভাইরাসটির অনেকটি মুকুটের মতো দেখায়। ল্যাটিন ভাষায় ‘কোরোনাম’ শব্দের অর্থ মুকুট । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই সকল তথ্য-উপাত্ত বিবেচনায় নিয়ে ১১ই ফেব্রুয়ারি ২০২০ সালে এর নামকরণ করে covid-19 । আজ পর্যন্ত চিকিত্সা বিজ্ঞান শুধু মাথা কুটে মরেছে কিন্তু এর ডিনামিক্সের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয় নি। তবে অনুমান করা হয়, এটি কোন প্রাণী থেকে এসেছে ।

অতি সম্প্রতি কানাডায় ক্লোরোকুইনের ব্যবহার শুরু হয়েছে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহূত ওষুধের কথা ঘোষণা দেন। সেই বক্তব্যে COVID-১৯ প্রতিরোধ এবং চিকিত্সায় ক্লোরোকুইন এবং এজিথ্রোমাইসিনের কথা উল্লেখ করেন। এই ভিডিওটি সারা বিশ্বে ভাইরাল হয়। ফলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশের বিপুলসংখ্যক সাধারণ জনগণ এই দুইটি ওষুধকে ‘অব্যর্থ’ বিবেচনা করছে। এমন কি মুড়ি মুড়কির মতো কিনে ঘরে মজুত করে রাখবার কথা শোনা গেছে। অথচ অদ্যাবধি FDA এই ওষুধ দুইটিকে বাজারে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ছাড়বার অনুমতি প্রদান করেনি। তবে আমেরিকার চিকিত্সকরা ক্ষেত্র বিশেষে FDA-এর অনুমোদন ব্যতিরেকে বিশেষ বিশেষ ওষুধ প্রেসক্রাইব করতে পারেন।

যে ওষুধগুলো কেবলমাত্র চিকিত্সকের পরামর্শে সেবন করতে হয় ক্লোরোকুইন সেই পরিবারেরই সদস্য । এই ওষুধের সেফটি মার্জিন খুব ন্যারো । যে ওষুধগুলোর সেফটি মার্জিন ন্যারো সেগুলোর ডোজ সামান্য বেশি হলেই মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে । এমন কি মৃত্যুরও আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশে এন্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার অনেক বিস্তৃত বর্ণালীর এন্টিবায়োটিককে রেজিস্ট্যান্স করে ফেলেছে। ফলে কানাডা বা মার্কিন মুল্লুকের মতো বাংলাদেশে এজিথ্রোমাইসিন সমভাবে কার্যকরী কি না সেটি বলবার সময়ও এখন আসেনি। তাই, বাংলাদেশের ড্রাগ প্রশাসনের পক্ষ হতে covid-19-এর চিকিত্সায় চিকিত্সকের পরামর্শ ব্যতীত এই দুইটি ওষুধ বা যে কোনো ওষুধ সেবন না করবার জন্য সতর্কবাণী গণমাধ্যমে বারংবার উচ্চারণ করা হচ্ছে । করোনায় আক্রান্ত হয়েছে সেই আশঙ্কা এবং রোগটি লুকিয়ে নিজে নিজে চিকিত্সা করতে যেয়ে প্রাণহানির খবর সোশ্যাল মিডিয়ায় সয়লাব হয়ে গেছে ।

করোনার মতো সর্বগ্রাসী রোগের পুরোপুরি কার্যকরী ওষুধ এবং প্রতিষেধক দ্রুত আবিষ্কার হোক। শত কষ্টে জর্জরিত ধরিত্রী মাতা করোনা চিকিত্সায় একটু আশার আলো খুঁজে পাক।

n লেখক :ক্লাসিফাইড স্পেশালিস্ট, ফার্মাকোলজি

আর্মড ফোর্সেস মেডিক্যাল কলেজ