করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সারা দেশের মতো নওগাঁর রাণীনগরেও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে সকল হাট-বাজার, দোকান-পাট ও যান চলাচল। এমতাবস্থায় উপজেলার শতাধিক খামামিরা তাদের উৎপাদিত পোলট্রি মুরগি নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন। অর্ধেক দামেও বিক্রি হচ্ছে না এই সব মুরগি। এতে পুঁজি হারিয়ে পথে বসতে শুরু করেছে খামারিরা। তাই কৃষির মতো এই পোলট্রি শিল্পটাকে বেঁচে রাখার জন্য এই সংকটময় সময়ে সরকারের কাছে ভুর্তকি ও সহায়তা কামনা করেছেন তারা।
সূত্রে জানা গেছে, প্রাণীজ ও আমিষের সিংহ ভাগই আসে পোলট্রি মুরগি থেকে। এক সময় এই শিল্পটি অত্যন্ত লাভজনক হলেও বর্তমানে পোলট্রি মুরগির খাবারের উপর অতিরিক্ত কর আরোপ ও ওষুধের মূল্য বৃদ্ধি করায় লাভের পরিমাণ কমে গেছে অনেকটাই। তবুও বেকারত্বকে জয় করার লক্ষ্যে কিছু শিক্ষিত বেকার যুবক, গৃহিণী ও কিছু মানুষরা এই শিল্পটিকে লাভের আশায় ধরে রেখেছে। কিন্তু সারা বিশ্বের মতো হঠাৎ মরণঘাতক করোনা ভাইরাস বাংলাদেশেও আক্রমণ করে। আর এই কারণে ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য সরকার অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য সবকিছু বন্ধ করে দেয়। এতে খামারে উৎপাদিত পোলট্রি মুরগিগুলো এখন খামারীদের গলায় বিষের কাটা হয়ে বেধেছে। এই অঞ্চলে উৎপাদিত পোলট্রি মুরগি প্রধানত ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর, দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় চালান হতো। কিন্তু যান চলাচল বন্ধ থাকার কারণে এই মুরগিগুলো বাজারজাত করা যাচ্ছে না। যে মুরগি পূর্বে ১১৫-১২০টাকা কেজি বিক্রি হতো বর্তমানে করোনা ভাইরাসের কারণে ৬০-৭০টাকা কেজিতেও কেউ কিনছেন না। যার কারণে বাধ্য হয়েই মুরগি খামারে রাখতে হচ্ছে। এতে করে খাবার ও ওষুধ বেশি লাগছে।
খট্টেশ্বর রাণীনগর গ্রামের খামামি বাপ্পী বলেন,বেকারত্ব দূর করার লক্ষ্যে বিভিন্ন জায়গা থেকে ঋণ নিয়ে একটি খামার করেছি। বর্তমানে করোনা ভাইরাসের কারণে আমি মুরগি বিক্রি করতে পারছি না। এতে আমার খরচ দ্বিগুন হচ্ছে এবং বেশিদিন মুরগি খামারে থাকার জন্য মরেও যাচ্ছে। আমি এখন চরম বিপাকে পড়েছি। এভাবে আর কিছু দিন চলতে থাকলে আমাকে পথে বসতে হবে।
চনমনু গ্রামের খামারি নুরজাহান বেগম বলেন, এমনিতে এই শিল্পটি লোকসানে পরিণত হয়েছে তার উপর আবার করোনা ভাইরাসের কারণে মুরগি বিক্রি করতে পারছি না। আর মুরগি বিক্রি না হওয়াই আমি খাবারও কিনতে পারছি না বাচ্চাও কিনতে পারছি না। আমি বর্তমানে চর্তুমুখি সমস্যায় পড়ে গেছি। তাই আমি খামারিদের উপর সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি। তা নাহলে এই শিল্পটি ধ্বংস হয়ে যাবে দেশের লাখ লাখ খামারিরা নিঃস্ব হয়ে পথে বসবে।
দড়িয়াপুর গ্রামের খামারি মতিউর রহমান উজ্জ্বল হোসেন বলেন, এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পটির প্রতি সরকারের কোন সুদৃষ্টি নেই। তা না হলে এই শিল্পের প্রধান উপকরণ খাদ্য, ওষুধসহ অন্যান্য জিনিসের দাম হু হু করে বৃদ্ধি পায় কেমন করে। যার কারণে এই শিল্পটি লাভের স্থানে লোকসানে পরিণত হয়েছে। তাই এই সংকটময় সময়ে দেশের লাখ লাখ খামারিদের বাঁচানোর জন্য সরকারের উচিত খামারিদের সঠিক তালিকা করে ভুর্তকি প্রদান করা।
আফতাব ফিড কোম্পানির ডিলার কেএইচএম নয়ন খাঁন লুলু বলেন, পোলট্রি শিল্পটি আজ ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে। প্রান্তিক খামারিরা আস্তে আস্তে এই ব্যবসাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ দিন দিন ওষুধ, বাচ্চা ও খাবারের দাম যে পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে লাভের কোন আশা নেই। বড় বড় কোম্পনিকে সরকার ব্যাপক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করলেও প্রান্তিক পর্যায়ের খামারি ও ডিলারদের জন্য সরকারের কোন সুযোগ-সুবিধা নেই। যদি সরকার স্বল্প সুদে ঋণ দিতো তাহলে খামারিরা কিছুটা হলেও লাভবান হতো। এই শিল্পটিকে বেঁচে রাখতে চেষ্টা করতো।
জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো: হেলাল হোসেন বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে লোকসানে পড়া খামারিদের ভুর্তকি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত কোন নির্দেশনা আসেনি। তবে আমি এই বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আর্কষণ করবো।
নওগাঁ-৬ (আত্রাই-রাণীনগর) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক ইসরাফিল আলম বলেন, পোলট্রি শিল্পটি একটি সম্ভাবনাময় শিল্প। অনেক শিক্ষিত বেকার যুবক ও মানুষরা পোলট্রি মুরগির খামার করে বেকারত্বকে জয় করেছে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে বর্তমানে এই শিল্পটি ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে আমি এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত আমার নির্বাচনী এলাকার খামারিদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদানের জন্য চেষ্টা করবো। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ এবং এই শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য আগামীতে আমি জাতীয় সংসদে খামারিদের সুযোগ-সুবিধা প্রদানসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করবো।
ইত্তেফাক/এমআরএম