জানা-অজানা

গ্রামোফোন

সুশান্ত কুমার রায়

গ্রামোফোন বা ‘কলের গান’ ছিল এক সময় অভিজাত পরিবারে গান শোনার জনপ্রিয় মাধ্যম। বাঙালির চিত্তবিনোদনের প্রধান উপকরণ। গ্রামোফোনের আবির্ভাব ও গান রেকর্ডিয়ের রয়েছে এক ঐতিহ্যময় ইতিহাস। টমাস এডিসন ১৮৭৭ সালে শব্দযন্ত্র আবিষ্কার করেন। এই গ্রামোফোন বা কলের গান এডিসনের ফোনোগ্রাফেরই উন্নত সংস্করণ। গ্রামোফোনের কল্যাণে বাংলাগান এবং সেইসঙ্গে শাস্ত্রীয় সংগীতেরও শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। সেই সময় শব্দধারণ প্রক্রিয়া চালু করতে এফ ডব্লিউ গেইসবার্গ বহুবার ভারতের বিভিন্ন জায়গা ও কলকাতা সফর করে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি ছিলেন গ্রামোফোন কোম্পানির প্রথম রেকর্ডিং ইঞ্জিনিয়ার। গ্রামোফোন রেকর্ড তৈরি করার ক্ষেত্রে প্রথম ভারতীয় উদ্যোক্তা হেমেন্দ্রমোহন বসু এবং বাণিজ্যিকীকরণের ক্ষেত্রে মানিকলাল সাহা ছিলেন প্রথম উদ্যোক্তা, যিনি মূলত পেশায় ছিলেন হারমোনিয়াম নির্মাতা।

এফ ডব্লিউ গেইসবার্গ ১৯০২ সালে প্রথম ভারতীয় শিল্পী গওহর জানের গানের রেকর্ড তৈরি করেন। সাত ও দশ ইঞ্চি ব্যাসের রেকর্ডে ধারণ করা হয় তাঁর গানগুলো। রেকর্ডগুলো অল্পদিনের মধ্যে শ্রোতাদের মধ্যে সাড়া জাগায়। বিশ শতকের শুরুতেই গ্রামোফোন কোম্পানিগুলো ভারতীয় বাজারে এক বিশাল জায়গা করে নিতে সমর্থ হয়। সেই সময় কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত জনপ্রিয় গ্রামোফোন কোম্পানিগুলোর মধ্যে হিজ মাস্টারস ভয়েজ, কলম্বিয়া, ওডিয়ন, পাইওনিয়ার ও পঠে অন্যতম। প্রথমদিকে গানের রেকর্ডগুলো তৈরি হতো শক্ত রাবার দিয়ে। পরবর্তী সময়ে স্লেট ও চুনাপাথরের মিশ্রণ এবং ১৯০৭ সালে ফাইবার দিয়ে রেকর্ড তৈরি হয়। শব্দ ধারণে ডিস্কের ঘুর্ণনগতি আবশ্যকীয় একটি বিষয় এবং প্রতি মিনিটে ঘূর্ণন সংখ্যা দ্বারা এই মান নির্ধারিত হয়। প্রথমদিকে স্বল্পবাদন রেকর্ড এবং পরবর্তীকালে রেকর্ডের ব্যাস বৃদ্ধি ও ঘুর্ণনগতি বাড়িয়ে দীর্ঘবাদন রেকর্ড (Long Playing Record) প্রকাশিত হয়। ১৯৪৮ সালে কলম্বিয়া কোম্পানি প্রথম দীর্ঘবাদন রেকর্ড প্রকাশ করে।

গ্রামোফোনের রেকর্ডের মাধ্যমে জগদীশ চন্দ্র বসু, প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র এবং দ্বিজেন্দ্রনাথ লাল রায়ের মতো বিখ্যাত ব্যক্তিদের বাণী, সাক্ষাত্কার ও আবৃত্তি ধারণ করা সম্ভব হয়েছে। গ্রামোফোনে কাজী নজরুল ইসলামের অবদান ও সৃষ্টিকর্ম সর্বজন প্রশংসিত। কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন গ্রামোফোনের প্রধান গীত রচয়িতা, সুরস্রষ্টা ও সংগীত প্রশিক্ষক। হিজ মাস্টারস ভয়েস গ্রামোফোন কোম্পানিতে ১৯২৮ সালে নজরুল আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন। নজরুলের লেখা ও সুরে গান গেয়ে অনেক শিল্পী খ্যাতি অর্জন করেন এবং রেকর্ড কোম্পানি আর্থিকভাবে লাভবান হয়।

গ্রামোফোন রেকর্ডে যে সমস্ত শিল্পীর গান স্মরণীয় হয়ে আছে—তাঁদের মধ্যে আছেন গওহর জান, লালচাঁদ বড়াল, কাশেম মল্লিক, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ আবদুল করিম খাঁ, ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ, ওস্তাদ বড়ে গুলাম আলী খাঁ, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, বিমল দাশগুপ্ত, তুলসী লাহিড়ী, আব্বাস উদ্দীন আহমেদ, কাজী নজরুল ইসলাম, পঙ্কজ কুমার মল্লিক, কুন্দ লাল সায়গল, আঙ্গুর বালা, ইন্দু বালা, শচীন দেব বর্মন, কানন বালা দেবী, জ্ঞানেন্দ্র প্রসাদ গোস্বামী, বেগম আখতার, সুধীর লাল চক্রবর্তী, কমলা ঝরিয়া, জগন্ময় মিত্র, যুথিকা রায়, পিয়ারু কাওয়াল, কাল্লু কাওয়াল, হীরেন বসু, সুর সাগর হিমাংসু দত্ত, অনুপম ঘটক, দুর্গা সেন, তিমির বরণ, প্রতিমা পান্ডে বরুয়া, আয়েষা সরকার প্রমুখ।

প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতির কারণে কয়েক দশক আগেই আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে গ্রামোফোন বা কলের গান।