গার্মেন্টস কারখানা চালু বা বন্ধ রাখা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমন্বয়হীনতায় করোনা পরিস্থিতির মধ্যে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি ছুটির মধ্যেও কারখানা চালু রাখার সিদ্ধান্ত থাকায় দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার শ্রমিক করোনা ভাইরাসের ঝুঁকির মধ্যে ঢাকামুখী হন। এরপর গভীর রাতে ঘোষণা আসে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত কারখানা বন্ধ রাখার।
কিন্তু শিল্পাঞ্চলগুলোতে সাতসকালেই হাজার হাজার শ্রমিক কারখানামুখী হন। অর্থাত্, শেষ বেলায় দেওয়া বিজিএমইএর অনুরোধ রাখেনি অনেক কারখানাই। করোনা ভাইরাস রোধে সামাজিক দূরত্ব মানার নির্দেশনা থাকলেও এসব শ্রমিকের ক্ষেত্রে বাস্তবে তা হয়নি। অন্যদিকে কারখানার মধ্যেও যথাযথ স্বাস্থ্য নিরাপত্তা মানা হয়নি বলে জানা গেছে। গতকালও শ্রমিকদের একটি অংশ ঢাকামুখী ছিল। এর মধ্যেই গতকাল ঢাকা থেকে দেশের বাদবাকি অংশ কার্যত বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে।
শিল্পাঞ্চল পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, গতকালও দেশের সব শিল্পাঞ্চলেই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কারখানা চালু ছিল। কেবল গাজীপুরেই খোলা ছিল ৩১৭টি শিল্পকারখানা। আজও এসব কারখানা খোলা থাকতে পারে বলে গতকাল ইত্তেফাককে জানিয়েছেন শিল্পাঞ্চল পুলিশের গাজীপুর জেলার এসপি সিদ্দিকুর রহমান। এ সময় কোনো কোনো কারখানায় শ্রমিকেরা কাজ করতে না চাইলে তাদের কারখানার মালিকপক্ষ কর্তৃক চাকরি থেকে ইস্তফা দেওয়ার জন্যও চাপ দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
শ্রমিক সংগঠনের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞরা শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলে কারখানা চালু রাখায় তীব্র সমালোচনা করেছেন। এজন্য তারা গার্মেন্টস শিল্পের মালিক, তাদের সংগঠন ও সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দিকেও আঙুল তুলেছেন। গতকাল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক বিবৃতিতে বলেছে, জাতীয় স্বার্থ পরিপন্থি মালিকপক্ষের এই অবিবেচনাপ্রসূত স্বার্থপর আচরণে অসংখ্য শ্রমিক এবং কার্যত গোটা দেশই করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়েছে। মালিকদের হুমকিতে ‘চাকরি বাঁচাতে’ দূর-দূরান্ত থেকে অসংখ্য শ্রমিক যেভাবে পায়ে হেঁটে কাজে যোগ দিতে বাধ্য হয়েছেন, তা শ্রমিকের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার অধিকারের চূড়ান্ত লঙ্ঘন। সংস্থাটির নির্বাহি পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এই যে শ্রমিকেরা এত কষ্ট করে, ঝুঁকি নিয়ে ফিরলেন, তারা মধ্যরাতে কোথায় যাবেন, তা কি একবারও ভেবেছে মালিকপক্ষ? গতকালের কারখানা খোলা রাখার প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, আর কতটা অমানবিক হবেন তারা? রানা প্লাজায় ঝুঁকি নির্ধারিত হওয়া সত্ত্বেও কর্মীদের কাজে যোগদানে বাধ্য করা হয়েছিল। এখন করোনা-কোভিডের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিশ্চিত জেনেও তৈরি পোশাক কারখানার মালিক ও তাদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ একই কাজ করল।
শ্রমিক নেত্রী ও গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার বলেন, পুরো দেশ করোনা ভাইরাসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত। এর মধ্যে শ্রমিকদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলা হয়েছে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেও বেশ কয়েকটি কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাই চলছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে কয়েক হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হয়ে গেছে। শ্রমিক ছাঁটাই ও ফেব্রুয়ারির বেতন ইস্যুতে গতকালও গাজীপুরের একটি কারখানায় শ্রমিকেরা দিনভর অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
কারখানার মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের বেশ কয়েক জন প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, বিজিএমইএর কেন্দ্রের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কারখানার মালিকদের সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল। অন্যদিকে কিছু সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও তাদের আপত্তি ছিল। বিজিএমইএ থেকে সদস্য কারখানাগুলোকে সাধারণ ছুটি দিতে বলা হয়েছিল, যাতে অনেক কারখানার মালিক রাজি ছিলেন না। বরং তারা লে-অফে (আপত্কালীন ছুটি) আগ্রহী ছিলেন। কেননা, সাধারণ ছুটিতে শ্রমিকের পুরো পাওনা পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু লে-অফের ক্ষেত্রে মূল বেতনের অর্ধেক ও বাড়িভাড়া ভাতাই পরিশোধ করতে হয়। ফলে কেন্দ্রের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কারখানার মালিকদের মতপার্থক্য তৈরি হয়। এ কারণে বিজিএমইএর অনুরোধ উপেক্ষা করেই অনেক কারখানা গতকাল খুলেছে।
অন্যদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারখানা বন্ধের ক্ষেত্রে মূল সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন ছিলো শ্রম মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু শ্রম মন্ত্রণালয় এ সিদ্ধান্ত দেয়নি। গত ২৭ তারিখে একটি প্রজ্ঞাপনে বলেছিল, যেসব কারখানার হাতে কাজ রয়েছে এবং যারা স্বাস্থ্য সুরক্ষা সরঞ্জাম তৈরি করছে, তারা যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চালু করতে পারবে। মূলত এই সুযোগ নিয়েই অনেক কারখানা কাজ চালিয়েছে। শ্রমিকনেতা বাবুল আক্তার ইত্তেফাককে বলেন, মূলত কারখানা বন্ধ রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার ছিল সরকারের।
গতকাল পর্যন্তও এই অবস্থান পরিবর্তন করেনি মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই) মহাপরিদর্শক শিবনাথ রায় গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমাদের আগের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন নেই। বন্ধ করে দিলে দরকারি পণ্য কীভাবে তৈরি হবে?’
কারখানা খোলার আগে দল বেঁধে সব শ্রমিকের ঢাকামুখী হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে শ্রমিকনেতা বাবুল আক্তার বলেন, ছুটির পর প্রথম খোলার দিন কাজে যোগ না দিলে পূর্বের সরকারি ছুটি অনুপস্থিত হিসেবে গণ্য করার একটি অলিখিত নিয়ম রয়েছে কারখানায়। আবার অনুপস্থিত থাকলে বেতন স্থগিত থাকা, সর্বোপরি চাকরির ভয়ে শ্রমিকেরা এসেছেন। এ সময় তিনি বলেন, বিজিএমইএ নেতাদের মধ্যেও অভ্যন্তরীণ সমস্যা রয়েছে। অন্যদিকে নানান ইস্যুতে বিজিএমইএর বর্তমান নেতৃত্বের সঙ্গে সংগঠনটির সাবেক ও প্রভাবশালী নেতাদের বড়ো অংশের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব চলছে।
কারখানা পরিস্থিতি :
আমাদের স্টাফ রিপোর্টার তুহিন খান জানিয়েছেন, গতকাল সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের অর্ধশতাধিক পোশাক কারখানা চালু ছিল। আর এসব কারখানায় সামাজিক দূরত্ব না মেনে দলে দলে শ্রমিকদের কারখানায় প্রবেশ করতে দেখা গেছে। তবে বেশির ভাগ কারখানাই ছিল বন্ধ।
এদিকে চট্টগ্রামেও বেশ কিছু কারখানা খোলা ছিল বলে জানা গেছে। চট্টগ্রাম ইপিজেড ও কর্ণফুলী ইপিজেডে ৪০ শতাংশের মতো কারখানা খোলা ছিল বলে সেখানকার একটি কারখানার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। কারখানা চালু ছিল নারায়ণগঞ্জেও।
এদিকে সরকার সাধারণ ছুটি ১১ তারিখ থেকে বাড়িয়ে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত করেছে। এ পরিস্থিতিতে কারখানার ছুটিও ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানোর জন্য কারখানার মালিকদের ফের অনুরোধ করেছেন বিজিএমইএর সভাপতি ড. রুবানা হক।