চয়ন

জয়নুল আবেদিনের বক্তব্য থেকে উদ্ধৃতি

সমগ্র মানবজাতির জন্য সুন্দর জীবন নির্মাণ করাই হচ্ছে শিল্পকলার মৌল উদ্দেশ্য। আমি প্রায়ই বলি, একটি সুন্দর রং সুন্দর, কিন্তু তার চেয়ে বেশি সুন্দর হলো একটি সুন্দর মুখাবয়ব, তারও চেয়ে সুন্দর একটি সুন্দর মন বা সুন্দর চরিত্র। মন ও চরিত্রকে সুন্দর করার জন্য অন্যান্য অনেক গুণের সাথে শৈল্পিক গুণ থাকা এবং শিল্পকলার প্রতি গভীর অনুরাগ থাকা বাঞ্ছনীয়।

আমি প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে ছবি আঁকছি, মহত্ শিল্পী হবার আকাঙ্ক্ষায় নয়, আমার জীবনকে সুন্দর করার জন্য। আমি  কেমন ছবি এঁকেছি আমি জানি না, কিন্তু কেন ছবি আঁকি তা বলতে পারি। আমি ছবি আঁকি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে তুলে ধরার জন্য, জীবনে যা সুন্দর এবং জীবনে যা সুন্দর নয় তাকেও দেখাবার জন্য, জীবনে সুন্দরের প্রতিষ্ঠায় যে শান্ত্তি বিরোধিতা করে, তাকেও চিহ্নিত করার জন্য। যে ছবি মানুষকে সুন্দরের দিকে নিয়ে যেতে পারে, সেটাই হচ্ছে মহত্ ছবি, যে শিল্পী তা পারেন তিনি মহত্ শিল্পী। আমার সারা জীবনের শিল্প-সাধনা ও শিল্প-আন্দোলন আমার জীবনকে এবং আমাদের সবার জীবনকে সেই সুন্দরের দিকে নিয়ে যাবার আন্দোলন।

২

পরিবেশ মানুষকে যা শেখায় তাই সে শেখে। আমার শিক্ষক নদী। আমার শৈশব কেটেছে নদীর তীরে। আমি দেখেছি পদ্মা আর ব্রহ্মপুত্রের তীরের মানুষের গানের টান ভিন্ন ভিন্ন। একই গান ব্রহ্মপুত্রের তীরের মানুষরা যেভাবে গায়, পদ্মার তীরের মানুষরা সেভাবে গায় না। ব্রহ্মপুত্রের গানের টান দীর্ঘ। আর পদ্মার তীরের গানের তাল টুকরো টুকরো। পরিবেশের জন্যেই এমন হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র সেখানে তার ঢেউয়ের সঙ্গে ওঠানামা করে।

৩

আমি নিজে শিল্পকর্ম করে যত আনন্দ পাই তার চেয়ে বেশি আনন্দ পাই শিল্পকলাকে সুপ্রতিষ্ঠিত হতে দেখলে—জীবনে প্রবিষ্ট হতে দেখলে। ছবি আঁকার সাফল্যের চেয়ে আমি তৃপ্তি পাই আরো অনেকে ছবি আঁকতে পারবে এমন একটি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করবার প্রচেষ্টায়। আমি মনে করি এখান থেকেই জন্ম নিতে পারে ‘সুন্দরকে’ প্রতিষ্ঠা করার নির্মাতারা। আমি একটি সুন্দর ছবি বা মহত্ ছবি এঁকে আর কতদূর কী করতে পারব। ‘শিল্পকলা শুধু শিল্পকলার জন্য’ এ ধরনের  বিশ্বাস আমার নয়। আমি বিশ্বাস করি শিল্পকলা মানুষের কল্যাণের জন্য, জীবনকে সুষম ও সুন্দররূপে  গড়ে তোলার জন্য। প্রকৃতি, মানুষের জীবন ও সবকিছু এক হয়ে যাবে তখনই,  যখন সম্ভব হবে সুন্দরের সৃষ্টি। সেই অবস্থায় পৌঁছুতে হলে সকলকে সুন্দরের মর্ম বুঝাতে হবে। শিল্পকলার চর্চা সেজন্যেই সার্বজনীন করা একান্ত বাঞ্ছনীয়। তার জন্য চাই জাতীয় চিত্রশালা, জাতীয় লোকশিল্প জাদুঘর। চাই সর্বস্তরে শিল্পকলা চর্চা ও শিক্ষার অবাধ সুযোগ। অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য ও মুক্তি যেমন সবার কাম্য তেমনি কাম্য হওয়া উচিত সুন্দর রুচিশীল ও সত্ জীবন, শৈল্পিক জীবন। আমি বারবার বলি আমাদের বর্তমান দুর্ভিক্ষ—খাদ্যের দুর্ভিক্ষ ততটা নয়, যতটা রুচির দুর্ভিক্ষ। একে দূর করতেই হবে। হয়তো সেক্ষেত্রে আমাদের সংগ্রাম ঐ উভয় দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে।

সূত্র: জয়নুল আবেদিনের সারাজীবন/ হাশেম খান (সময় প্রকাশন, ২০০৩)