মহসীন হাবিব
নিঃসন্দেহে একজন ব্যবসায়ী তার ব্যবসায় শ্রম দিয়ে থাকেন লাভের আশায়। লাভ না করলে তিনি অস্তিত্বের সংকটে পড়বেন। একজন ব্যবসায়ী যখন পুঁজি বিনিয়োগ করেন, সেই পুঁজি শ্রমে রূপান্তরিত হতে থাকে। সেই শ্রম থেকে আসে উত্পাদন। সুতরাং ব্যবসায়ী লাভ করবেন এ নিয়ে কারো কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। আপত্তি থাকেও না, বরং সমাজে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরা মানুষের কাছে পর্যাপ্ত সমীহ পেয়ে থাকেন। সমাজ তাকে সম্মান করে, সালাম জানায়। অতীতে তিনি কী করেছেন, কীভাবে উপার্জনের প্রথম সিঁড়ি পার করেছেন, সে সম্পর্কেও কেউ কোনো রা করে না। এমনকি রাষ্ট্র ও সরকার তাকে সমীহ করে, অনেকভাবেই সম্মানিত করে। প্রতি বছর স্বীকৃতিস্বরূপ কমার্শিয়ালি ইম্পর্টেন্ট পারসন বা সিআইপি সম্মানে ভূষিত করা হয়। শুধু বাংলাদেশ কেন, যে কোনো দেশেই ব্যবসায়ীদের রাষ্ট্র পরিচালনায় এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রভাব বিস্তার করতে দেখা যায়। সেটাও নতুন নয়। ইতিহাসে বহু দেশে, বহুবার ব্যবসায়ীরা রাজাকে উঠিয়েছেন, নামিয়েছেন। শুধু কি তাই? রাজাদের সেই যুগ পার হওয়ার পর গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে বরং ব্যবসায়ীরাই হয়ে উঠছেন রাজনীতিবিদ, রাজনীতির অনুঘটক।
কিন্তু ব্যবসায়ী যখন অধিক লোভী হয়ে পড়েন, তখন সমাজ তাকে কীভাবে দেখে? ব্যবসায়ীকে মানুষ ভাবতে থাকে অর্থসর্বস্ব একটি মেশিন। এখন থেকে ৪০০ বছরের বেশি সময় আগে উইলিয়াম সেক্সপিয়ার লিখেছিলেন, ‘মার্চেন্ট অব ভেনিস’, অর্থাত্ ভেনিসের ব্যবসায়ী। পৃথিবীব্যাপী এত বেশি পঠিত গ্রন্থ খুব কম আছে। জানা কাহিনি, তবু সংক্ষেপে একটু বলি। ভেনিসের ব্যবসায়ী শাইলক সুদে টাকা ধার দেয় অ্যান্টনিওকে। কথা ছিল অ্যান্টনিও যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা ফেরত দিতে না পারে, তাহলে তার গা থেকে এক পাউন্ড মাংস কেটে নেওয়া হবে। অ্যান্টনিও ঋণের টাকা সময়মতো দিতে ব্যর্থ হয়। শাইলক তার চুক্তিমতো আদালতে যায় অ্যান্টনিওর শরীর থেকে মাংস কেটে নিতে। কিন্তু বাসানিওর প্রেমিকা পোর্তিয়া উকিলের বেশে আদালতে উপস্থিত হয়ে শর্ত দেয়, মাংস শরীর থেকে সে কেটে নিতে পারে শর্ত অনুযায়ী, তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু শরীর থেকে কোনো রক্ত ঝরতে পারবে না অথবা রক্ত নিতে পারবে না। যেহেতু সেটা সম্ভব নয়, তাই শাইলক সে মামলায় পরাজিত হয়।
লক্ষণীয়, পেশায় ব্যবসায়ী অ্যান্টোনিও তার উদার চরিত্রের কারণে বিশ্বব্যাপী পাঠকদের কাছে এই নাটকের নায়ক হয়ে উঠেছে। আর শাইলক শর্তের বাইরে কিছু দাবি না করেও বিশ্বব্যাপী খলনায়ক হয়ে আছে। এর কারণ হলো, দুঃসময়ে শাইলক মানবিক বোধ ও উদারতা দেখাতে পারেনি।
সুতরাং, যার যে পেশাই হোক আর ব্যবসা যতই লাভের উদ্দেশে হয়ে থাকুক না কেন, কখনো কখনো এমন সময় উপস্থিত হয়, যখন মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবকিছু বিবেচনার প্রশ্ন আসে। ব্যবসার লাভ তখন গৌণ হয়ে যায়। হওয়াও উচিত। আর সেই মানবিক বোধ বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিক সংগঠন দেখাতে পারেনি দেশের তথা বিশ্বের এই মহাক্রান্তিকালে। অবশেষে গোটা দেশের চাপে পড়ে তারা তাদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে।
গত ২৫ মার্চ বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের হামলা তুঙ্গে উঠে গিয়েছিল। পৃথিবীর বড়ো বড়ো অর্থনীতির দেশ লকডাউনে চলে গিয়েছে, সোশ্যাল সিটেন্সিং শুরু হয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশের সরকার সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু তখনো গার্মেন্টসগুলোর সংগঠন বিজিএমইএ বন্ধ ঘোষণা করেনি। কেউ কেউ ধারণা করেছেন, এই বন্ধ না করার কারণ ছিল সরকারকে চাপে ফেলে একটি প্রণোদনা প্যাকেজ আদায় করে নেওয়া, যা তারা আগেও করেছেন। এরপর সরকারপ্রধান ৫ হাজার কোটি টাকার ঘোষণা দিলেন। অতঃপর ২৬ তারিখে পোশাক কারখানার মালিকেরা গার্মেন্টসগুলো বন্ধ ঘোষণা করে দিলেন। ইতিমধ্যে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ আরো বাড়তে থাকল। প্রাথমিক অবস্থায় সরকারের বন্ধের ঘোষণা ছিল ৪ এপ্রিল পর্যন্ত। কিন্তু সেটা বাড়িয়ে করা হলো ১১ এপ্রিল। এদিকে ঘটল আরেক ঘটনা। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়ে দিল, যে টাকা ঘোষণা করা হয়েছে তা খয়রাতি সাহায্য নয়, বরং সহজ শর্তে ঋণ। এবং ঐ অর্থের ওপর ২ শতাংশ সার্ভিস চার্জ দিতে হবে। সেই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানাল, ঐ টাকায় শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে হবে এবং তা পরিশোধ করতে হবে ব্যাংক একাউন্ট অথবা তা না থাকলে মোবাইল ফিন্যান্সিং সার্ভিসের মাধ্যমে। অর্থাত্, বিকাশ, রকেট এসবের মাধ্যমে। এ সময় গার্মেন্টস মালিকেরা দুটি কাজ করলেন। একটি হলো তারা বিবৃতি দিয়ে জানালেন যে সেটা সম্ভব নয়। কারণ বেশির ভাগ শ্রমিকের কোনো একাউন্ট নেই এবং অনলাইন ট্রানজেকশনের ব্যবস্থা নেই। সেই সঙ্গে আরেকটি ভয়াবহ তথ্য দিলেন যে অনেক শ্রমিকের ন্যাশনাল আইডিও নেই!
প্রথম কথা হলো, বাংলাদেশে এখন ন্যাশনাল আইডি নেই এমন পোশাকশ্রমিক খুঁজে পাওয়ার কথা নয়। দ্বিতীয় কথাটি আরো গুরুত্বপূর্ণ। যদি ন্যাশনাল আইডি না-ই থাকে, তাহলে কাকে চাকরি দিয়েছেন? সেই চাকরি করা মানুষটি যে রোহিঙ্গা অথবা বিদেশি নয়, তার কী প্রমাণ আপনার কাছে আছে? ন্যাশনাল আইডি ছাড়া চাকরি দেওয়া যাবে এমন বিধান কি বিজিএমইএর বিধিতে আছে?
সেই সঙ্গে তারা দ্বিতীয় যে কাজটি করলেন, তা আরো চাতুর্যপূর্ণ বলেই অনেকে মনে করছেন। ছুটি সরকার বাড়িয়েছে, সে সম্পর্কে শ্রমিকদের কিছু জানালেন না। সহজ-সরল ও স্বল্প লেখাপড়া জানা এই মানুষগুলো স্বাভাবিকভাবেই ধরে নিলেন ৫ তারিখে চাকরিস্থলে গিয়ে যোগ দিতে হবে। তা না হলে চাকরি থেকে ছাঁটাইয়ের ভয় আছে। তারা করোনা ভাইরাসের ভয়কে উপেক্ষা করে হেঁটে রওনা দিলেন ১০০-১৫০ মাইলের পথ পারি দিতে। এ যেন ১৯৭১ সালের মতোই প্রাণ বাঁচানো যাত্রা!
করোনার ছোবলে সারাদেশে যখন সোশ্যাল ডিসটেন্সিং চলছে, তখন দেখা গেল রাস্তায় গায়ে গা ঘেঁষে চাকরি বাঁচানোর জন্য ছুটছেন হাজার হাজার শ্রমিক। নেটিজেনরা দেখলেন এ দৃশ্য। দেখলেন দেশি-বিদেশি অবজার্ভাররা। ক্ষেপে গেলেন তারা। ভাইরাল হয়ে গেল সারাদেশে বিজিএমইএর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ। স্পষ্ট হয়ে উঠল দেশবাসীর কাছে যে এরা আসলে অধিকার সংবলিত শ্রমিক নন, আধুনিক যুগে আমাদেরই চারপাশে থাকা মধ্যযুগীয় কৃতদাস!
এসব গার্মেন্টস মালিক কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে অচেনা-অপরিচিত নন। তাদের জীবনযাপন, তাদের লভ্যাংশ, তাদের শ্রম এক্সপ্লয়েটেশন—সব সম্পর্কেই মানুষ জানে। এরা ২০ হাজার ডলারের ঘড়ি হাতে দেন, কমপক্ষে সিঙ্গাপুর থেকে আসে তাদের খাওয়ার পানি। এদের মধ্যে এমন একজন খুঁজে পাওয়া কষ্ট, যার মালয়েশিয়া, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, লন্ডন বা এমন কোনো শহরে একটি বা দুটি বাড়ি নেই। তারা অর্থ আয় করবেন, সেটা নিয়ে খুব আপত্তি করছি না; কিন্তু শাইলকের মতো মাংস কেটে নেওয়ার ফন্দি কেন? এই মহাবিপদে কি তাদের তরফ থেকে কোনো ত্যাগ, কোনো ছাড় শ্রমিকেরা আশা করতে পারেন না? এই মহাদুর্যোগের সময় যদি একটি সংগঠন পাওয়া কাজের শ্রমঘণ্টা হিসাব করতে থাকে, তবে শাইলকের সঙ্গে পার্থক্য কী?
আরো অনেক কথাই তাদের সম্পর্কে বলা যায়। তা আমরা সাধারণত বলি না। কারণ একটি বড়ো উছিলা তো আছেই, ‘দেশে অর্ডার বন্ধ হয়ে গেলে অর্থনীতির চাকা মন্থর হয়ে যাবে।’ ২০১২ সালের তাজরীন ফ্যাশন এবং ২০১৩ সালে রানা প্লাজার ভয়াবহ মৃত্যুকাণ্ডের পর ইউরোপের ২২৮টি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত হয় অ্যাকর্ড অন ফায়ার অ্যান্ড সেফটি ইন বাংলাদেশ। এই প্রতিষ্ঠান সাধারণত অ্যাকর্ড নামেই পরিচিত। ২০১৮ সালের মে মাসে এর কার্যক্রম শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা বর্ধিত হয়েছে। কেন সেটাও কিন্তু ভাবতে হবে। ২০১৪ সাল থেকে অ্যাকর্ডের কাছে ১ হাজার ৯০০ অভিযোগ গিয়েছে, যার বেশির ভাগই কারখানার নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে। এটা ঠিক যে কমপ্লায়েন্স অনুসারে মালিকেরা শর্ত পূরণ করতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু অ্যাকর্ড এই দীর্ঘ সময়ে তাদের মাথাব্যথার কারণ হয়েছিল। বিগত দিনে তারা অ্যাকর্ডের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন। এ কথাও শুনতে হয়েছে যে অ্যাকর্ড অন্য কোনো দেশের হয়ে কাজ করছে, যাতে বাংলাদেশ থেকে ব্যবসাটি সরে যায়। কিন্তু মূল কথাটি ভেবে দেখেছেন কি? এদেশের মালিকেরা শ্রমিকবান্ধব হলে, কারখানায় অগ্নি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করলে, সত্যিকার স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ তৈরি করলে একর্ডের কোনো সুযোগ আছে আপনাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রতিবেদন তৈরি করার? নেই। লাভ তো নিশ্চয়ই করবেন। ছেলেমেয়েদেরও আপনারা ভালো স্কুলে, বিদেশে পড়াবেন, তাতেও আপত্তির কিছু নেই। সেই অর্থ আপনাদের এমনিতেই আসে। কিন্তু কয়লার দরে সোনা কেনার অভ্যস্থতা ত্যাগ করার সময় এসেছে। সেটা সত্যিকার ব্যবসায়ীর মতো গ্রহণ করুন। অনেক বিব্রতকর প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে না।
n লেখক :সাহিত্যিক ও সাংবাদিক