বঙ্গবন্ধুর খুনি পলাতক মাজেদ গ্রেফতার

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার দায়ে ফাঁসির রায় মাথায় নিয়ে পলাতক আসামি ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আবদুল মাজেদকে গ্রেফতারের পর কারাগারে পাঠানো হয়েছে। সোমবার গভীর রাতে রাজধানীর মিরপুর থেকে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। বিদেশে পলাতক বঙ্গবন্ধুর ৬ খুনির একজন আব্দুল মাজেদ।

ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে খুনি মাজেদকে তোলা হলে গতকাল মঙ্গলবার বিচারক এ এম জুলফিকার হায়াত্ এই দণ্ডিত আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এই আদেশের পরপরই দুপুর ১টা ৫ মিনিটের দিকে তাকে প্রিজন ভ্যানে করে কেরানীগঞ্জে অবস্থিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।

এর আগে দুপুর সোয়া   ১২টার দিকে ফৌজদারি কার্যবিধি ৫৪ ধারায় তাকে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। এ সময় বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় গ্রেফতার না দেখানো পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করা হয়।

আদালতে মাজেদের পরনে ছিল সাদা পাঞ্জাবি ও পাজামা। বুকে বুলেটপ্রুফ ভেস্ট ও মাথায় হেলমেট ছিল। কাঠগড়ায় তার মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া বোঝা যায়নি। আদালতে কোনো আইনজীবী মাজেদের পক্ষে দাঁড়াননি। আদালতের আদেশের পরপরই মাজেদকে কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আব্দুল মাজেদের বিরুদ্ধে রায় কার্যকর করা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ইত্তেফাককে বলেন, তার বিরুদ্ধে রায় কার্যকর করার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়ে গেছে। এটা শেষ হলেই তার ফাঁসি কার্যকর করা হবে।

কে এই মাজেদ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা মামলার পলাতক ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আবদুল মাজেদ একজন। তিনি ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার বাটামারা গ্রামের মরহুম আলী মিয়া চৌধুরীর ছেলে। সূত্র জানায়, আবদুল মাজেদের পরিবার বর্তমানে ঢাকা সেনানিবাসের আবাসিক এলাকায় বসবাস করছে। তার স্ত্রী পেশায় চিকিত্সক। আব্দুল মাজেদ চার কন্যা ও এক পুত্রসন্তানের জনক।

জানা গেছে, ১৯৭৫ সালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যাকাণ্ডের সময় মাজেদ অন্য খুনিদের (আসামি) সঙ্গে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। হত্যাকাণ্ড শেষে তিনি অন্য সেনাসদস্যদের সঙ্গে রেডিও স্টেশনে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি দেশত্যাগের আগ পর্যন্ত ক্যু করা অফিসারদের সঙ্গে বঙ্গভবনে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। তিনি হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারী অফিসারদের সঙ্গে তত্কালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের নির্দেশে বাংলাদেশ থেকে ব্যাংকক হয়ে লিবিয়ায় চলে যান। তিনি সেখানে তিন মাস অবস্থান করেন। সে সময় তত্কালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান  ক্যাপ্টেন মাজেদকে পুরস্কার হিসেবে সেনেগাল দূতাবাসে বদলির আদেশ দেন। পরে ১৯৮০ সালের ২৬ মার্চ জিয়াউর রহমান সরকার ক্যাপ্টেন আব্দুল মাজেদকে বিআইডব্লিউটিসিতে উপসচিব পদে চাকরি দেন। পরে তাকে সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এরপর তিনি মিনিস্ট্রি অব ইয়ুথ ডেভেলপমেন্টে ডাইরেক্টর পদে যোগদান করেন। সেখান থেকে তিনি ডাইরেক্টর অব হেড অব ন্যাশনাল সেভিংস ডিপার্টমেন্টে বদলি হন। 

ফিরে দেখা

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে বর্বরোচিত ও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। তখন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর  স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদ বিচারের হাত থেকে খুনিদের রক্ষা করতে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করেন। পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সকে আইন হিসেবে অনুমোদন করেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ১৯৯৬ সালের ১৪ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার তিন প্রধান আসামি লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী তাহের উদ্দিন ঠাকুরকে গ্রেফতার করা হয়। পরে আরো দুই আসামিকে বিদেশ থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

একই বছরের ২ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুর একান্ত সহকারী (পিএ) এ এফ এম মোহিতুল ইসলাম ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সংঘটিত নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় থানায় একটি এফআইআর করেন। ১৯৯৬ সালের ১৪ নভেম্বর খুনিদের বিচারে ন্যস্ত করতে পার্লামেন্টে ইনডেমনিটি আইন বাতিল করা হয়। ১৯৯৭ সালের ১৫ জানুয়ারি সিআইডি এই মামলায় ২০ জনকে অভিযুক্ত করে মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে চার্জশিট দাখিল করে এবং একই বছরের ১২ মার্চ ছয় আসামির উপস্থিতিতে আদালতে বিচার শুরু হয়।

১৯৯৭ সালের ১৯ জুন পর্যন্ত বিচারক বিব্রত হওয়াসহ নানা কারণে আট বার বিচার কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। এভাবে দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর মামলার রায়ে বিচারক কাজী গোলাম রসুল ১৫ জন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্ট বেঞ্চ ২৪ দিনের শুনানি শেষে এই আদেশের ওপর বিভক্ত রায় প্রদান করে। বিচারপতি এম রুহুল আমিন অভিযুক্ত ১৫ আসামির মধ্যে ১০ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বজায় রাখেন। কিন্তু অপর বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক অভিযুক্ত ১৫ জনকেই সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। পরে হাইকোর্টের তৃতীয় বেঞ্চে ১২ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে।

পরবর্তী সময়ে ২০০১ সালের অক্টোবরের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে বিচারকাজ বন্ধ থাকে। দীর্ঘ ছয় বছর পর ২০০৭ সালের ২৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষের মুখ্য আইনজীবী বর্তমান সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সুপ্রিম কোর্টে সংক্ষিপ্ত বিবৃতি প্রদান করেন এবং ২৩ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের তিন সদস্যের একটি বেঞ্চ ২৭ দিনের শুনানি শেষে ৫ আসামিকে নিয়মিত আপিল করার অনুমতিদানের লিভ টু আপিল মঞ্জুর করে।

অপর পাঁচ খুনি কোথায়

মাজেদ গ্রেফতারের পর এখনো বঙ্গবন্ধুর পাঁচ দণ্ডপ্রাপ্ত খুনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিয়ে আছেন। এর মধ্যে রাশেদ চৌধুরী আমেরিকায় ও নূর চৌধুরী কানাডায় অবস্থায় করছেন বলে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে সংবাদ বেরিয়েছে। এছাড়া শরিফুল হক ডালিম, কর্নেল রশীদ ও মুসলেহউদ্দীন রিসালদার পলাতক রয়েছেন। তারা সবাই সাবেক সেনা কর্মকর্তা। এই পাঁচ খুনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পলাতক অবস্থায় আছেন। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার।