ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার
করোনা প্রার্দুভাবের কারণে বর্তমানে সারাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত ও কলকারখানা ছুটি ঘোষণা করে বাসায় অবস্থান করার জন্য সরকারি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। জনসমাগমস্থল এখন পুরোপরি ফাঁকা। ওষুধ ও কাঁচাবাজারের দোকান ছাড়া সবকিছু বন্ধ। মৌলিক প্রয়োজন ও জরুরি কাজ ছাড়া বাইরে বের হওয়া নিষেধ। এ কারণে পিতা-মাতা, সন্তানসহ পরিবারের সব সদস্যই নিজ নিজ বাসায় অবস্থান করছেন। এতে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হচ্ছে। এতদিন যারা পরিবারকে সময় দিতে পারেননি তারা এখন পুরো সময় কাটাচ্ছেন বাড়িতে। হঠাত্ এ ধরনের জীবনে হাঁপিয়ে উঠলেও ত্যাগ স্বীকার করছেন সবাই। সুযোগ পেয়ে দাদা-দাদি বা পরিবারে বসবাসরত বয়স্ক ব্যক্তিরা তাদের পরশে স্মৃতি রোমন্থন করছেন। নাতি-নাতনিদের কখনো বলছেন ভূতের গল্প। বাসাই এখন বিনোদনকেন্দ্র। বিকেল হলেই কেউ-বা বারান্দা আবার কেউ ছাদে গিয়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে পাশের বাড়ির লোকজনের সঙ্গে গল্পগুজবে মেতে উঠছেন। যদিও মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে তথাপি প্রতিটি বাড়ি এখন সদস্যদের সার্বক্ষণিক উপস্থিতিতে মুখরিত এবং প্রাণচাঞ্চল্য বিরাজমান।
এখন পরিবারের সবাই সবাইকে সব সময়ের জন্য কাছে পাচ্ছেন, যা এর আগে কখনো হয়নি। সময়াভাবে পিতা-মাতা সন্তানদের সময় দিতে পারেননি। নিজ নিজ অফিস প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ের কাজে ব্যস্ত থাকার দরুন সন্তানদেরকে সময় দেওয়া হয়ে ওঠেনি। সন্তানরাও পড়াশোনার কারণে স্কুল, কলেজে ব্যস্ত থেকেছে। পরিবারের বয়স্ক ব্যক্তিরা আগে যেখানে ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনিদের কাছে পেতেন না, এখন সেখানে তাদেরকে সব সময় কাছে পাচ্ছেন। করোনার কারণে এখন সবই বাসা-বাড়িতে একত্রে দিন অতিবাহিত করছেন। আগে যেখানে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেনি, এখন সেখানে পিতা-মাতা সব সময় সন্তান ও বয়স্কদের সময় দিচ্ছেন। একত্রে গল্প করা, খাওয়াদাওয়া, টেলিভিশনে খবর, নাটক, সিরিয়াল বা টকশো দেখা, কখনো-বা ক্যারাম, দাবা, লুডু, স্বল্প পরিসরে ক্রিকেট ইত্যাদি খেলে অলস সময় কাটাচ্ছেন। পড়ার অভ্যেস না থাকলেও কিংবা সময়ের অভাবে পড়া না হলেও এখন অনেকেই গল্প বা উপন্যাসের বই পড়ছেন। বাড়িতে পুতুলের সঙ্গে চড়ুইভাতি করে কিংবা এক পুতুলের সঙ্গে আরেক পুতুলের বিয়ে দিয়ে সময় কাটাচ্ছে অনেক শিশু। দূর থেকে পিতা-মাতা বা পরিবারের অন্য সদস্যরা তা দেখে খুবই উপভোগ করছেন।
আমরা ব্যস্ততার কারণে অনেক সময় ভুলে যাই যে পিতা-মাতাই সন্তানদের একমাত্র অবলম্বন। পিতা-মাতার উচিত সব সময় সন্তানদের সময় দেওয়া। সন্তানদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অবশ্যই মধুর বন্ধুত্বপূর্ণ, স্নেহসুলভ এবং সহজ হতে হবে। প্রাথমিক অবস্থায় পিতা-মাতার প্রতি সন্তানদের যে মনোভাব এবং সম্পর্ক গড়ে ওঠে পরবর্তীকালে সেটাই তার জীবনে প্রতিফলিত হয়। সন্তানরা পিতা-মাতার ওপর অধিক নির্ভরশীল। সন্তানদের যেমন পিতা-মাতার সাহচর্য প্রয়োজন, তেমনি সন্তানদেরও। কিন্তু বিশ্বায়নের এই যুগে বিভিন্ন ব্যস্ততার কারণে পিতা-মাতা সন্তানদেরকে খুব একটা সময় দিতে পারেন না। পাশাপাশি বয়স্ক ব্যক্তিরাও এ থেকে বঞ্চিত হন।
সন্তানরা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমান্বয়ে পরনির্ভরতা কাটিয়ে পারস্পরিক বিশ্বাস ও নির্ভরতায় পৌঁছায়, যা পিতা-মাতা ও সন্তান উভয়ের জন্য সুফল বয়ে আনে। শৈশবে পিতা-মাতার সঙ্গে সহজ সম্পর্ক সন্তানদের প্রতিভা বিকাশে সহায়ক হয়। কিন্তু পিতা-মাতা অনেকেই সন্তানদের কোনো পর্যাপ্ত সময় দেন না বা দেওয়ার মতো সময় পান না। অথচ সন্তানদের চরিত্র গঠনে পিতামাতার দায়িত্ব সর্বাধিক। পিতা-মাতার আচরণগত প্রভাবের ওপর শিশুদের সুষ্ঠু বিকাশ নির্ভর করে। সন্তানরা পিতা-মাতার আচরণ অনুকরণ করে থাকে। আচরণের ক্ষেত্রে সন্তানদের ওপর খুবই কঠোর আবার একেবারেই শিথিল হওয়া যাবে না। প্রয়োজনে ক্ষেত্রবিশেষে তাদেরকে শাসন ও সোহাগও করতে হবে। সন্তানরা বড়ো হয়ে কেমন মানুষ হবে তার অনেকখানিই নির্ধারিত হয়ে যায় শৈশব ও কৌশোরে। পরিবারে পিতা-মাতাই একধরনের শিক্ষক। আচার-আচরণ, সংস্কৃতি শেখার প্রথম জায়গা হলো পরিবার। সন্তানদেরকে আদর্শ, মূল্যবোধ, নৈতিকতা, সংস্কৃতি ইত্যাদি পরিবার থেকে শেখাতে হবে। আর এক্ষেত্রে পিতা-মাতার দায়িত্ব সর্বাধিক।
করোনা পরিস্থিতির কারণে পরিবারের সবাইকে নিয়ে সাময়িকভাবে বাড়িতে থাকার সুযোগ হয়েছে। তাই এই সময়ে সবাইকে নিতে সুন্দরভাবে দিন অতিবাহিত করতে হবে। মূলত একঘেয়েমি কেটে যাবে দ্রুত। পরিশেষে সবার প্রতি বিনীত অনুরোধ, বাইরে বের না হয়ে বাড়িতে থাকুন। সরকারি ও চিকিত্সকের প্রদত্ত নির্দেশাবলি মেনে চলুন এবং সর্বোপরি সুস্থ থাকুন। আতঙ্ক নয়, সচেতনতাই প্রতিরোধ—এ কথাটি সব সময় মনে রাখাতে হবে।
n লেখক : সাবেক পুলিশ-র্যাব কর্মকর্তা