হাসান ইমাম
রাতের অন্ধকারে আঘাত হানা ঝড়ের তাণ্ডবের ছবি দিনের আলো না ফুটলে পুরো বোঝা যায় না। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব তেমন এক অন্ধকার সময়ে আঘাত, অন্ধকারে আঘাত। আরো দুর্ভাবনার কথা, স্বাভাবিক রাতের দৈর্ঘ্যের তুলনায় করোনাকালের স্থায়িত্বের কোনো পূর্বাভাস এখনো করা যাচ্ছে না। যদিও এই মহামারির প্রভাবে আগামী দিনের খোলনলচে যে বদলে যাবে, তা ‘অলঙ্ঘনীয়’ ভবিতব্য। সেই বদলের বিস্তৃতি-পরিধি যতটা যা-ই হোক, তার রং যে ‘ধূসর’ হবে তাতে সন্দেহমাত্র নেই। তবে সবচেয়ে বড়ো বদলটা যে প্রকৃতিতে ঘটবে তার আভাস এরই মধ্যে স্পষ্ট। মানুষের হই-হট্টগোলে উধাও ডলফিল, কচ্ছপ ফিরে আসছে নির্জন সমুদ্রসৈকতে; নৌযানের সংখ্যাধিক্যে স্রেফ জলপথে পরিণত হওয়া খালে এখন মাছেদের আনাগোনা, হাঁসের জলকেলি; বনের বুক চিরে তৈরি উন্নয়নের মহাসড়কে হেঁটে বেড়াচ্ছে বন্যপ্রাণী; দূষণে দমবন্ধ, ধুলোয় আচ্ছাদিত নগরে একটু-আধটু করে মাথা তুলছে সবুজ।
বিস্তৃত পরিসরে মানুষ প্রকৃতিরই অবিচ্ছেদ্য অংশ, তবু বাদবাকি প্রকৃতির সঙ্গে তার যে বনিবনা ভালো নয়, করোনায় লকডাউন বিশ্বে সেই বার্তা এরই মধ্যে উচ্চারিত। কিন্তু মানুষ কতটা পড়তে পারছে সেই বার্তা, দেখতে পাচ্ছে প্রকৃতির ক্রমে রোগমুক্ত’ হওয়া রূপ? যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্কের নেকড়ে হত্যার পর এই হিংস্র শ্বাপদকে পুনরায় ফেরানোর গল্প, চীনের ফোর পেস্টস ক্যাম্পেইন’-এর অধীনে চড়ুই পাখি তাড়িয়ে পঙ্গপালের তাণ্ডবে পড়ার অভিজ্ঞতা ইত্যাদি অজানা নয়। তবু পাহাড়ের চূড়া, সমুদ্রের তলদেশ, বরফের আচ্ছাদন, বনভূমির নির্জনতা, মাটির গভীরতা—হেন কোনো স্থান নেই, যেখানে মানবের ‘দানবীয়’ পা পড়েনি। আর এসবই হয়েছে তথাকথিত উন্নয়নের অজুহাতে, যার ডাকনাম ‘বিশ্বায়ন’। ‘বিশ্ববিনাশী’ এই বিশ্বায়নের পথে হাঁটতে গিয়ে প্রকৃতির ভারসাম্য কতটা বিঘ্নিত, জলবায়ু পরিবর্তন তার জাজ্বল্য প্রমাণ। এ যেন মড়ার (পৃথিবীর) ওপর খাঁড়ার ঘা। করোনা থেকে পরিত্রাণে অনেকেই তাই সাফ নিদান দিচ্ছেন বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থা মেরামতের। তাদের ভাষ্য, করোনার প্রাদুর্ভাব প্রকৃতির প্রতিশোধ, মানুষের অবিমৃশ্যকারিতার ফল।
অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি—যত ধরনের সম্ভাব্য পরিবর্তনের ছবি এই করোনাক্রান্ত সময়ে ত্রাসিত মানুষের মনে আঁকা হচ্ছে, এখনো তা সেভাবে সাকার পাচ্ছে না। কেননা, করোনার কালরাতের অন্ধকার কবে ঘুচবে, তা এখনো কেউ জানে না। এই অজানা আঁধার যদি জেঁকে থাকে অনির্দিষ্ট কাল, তবে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বিপর্যয়, পুঁজিবাদের ‘পচনের’ আশঙ্কাও ফিকে হয়ে যায়, বরং বিদ্যমান যাবতীয় ব্যবস্থায় যে ‘বিচ্ছিন্নতার নীতি’ কার্যকর, তার মোকাবিলা আর করোনার বিরুদ্ধে লড়াই সমার্থক হয়ে ওঠে। তবে যে কোনো ক্রান্তিকালের ইতিবাচক দিক, এটা সম্মিলনের সুযোগ এনে দেয়—মানুষে মানুষে সম্মিলন। করোনার সংক্রমণ রোধে যে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কথা বলা হচ্ছে, তা আসলে মানুষের যূথবদ্ধতারই ভিন্ন সংস্করণ। করোনাবিরোধী এই জনযুদ্ধের কৌশল সামাজিক দূরত্ব রচনা বটে, কিন্তু তা আসলে একে অপরের কাছে আসারই নামান্তর। প্রত্যেককে তার নিজের অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালনের সেই ডাক দিয়েছে করোনা। ভার্চুয়াল যোগাযোগনির্ভর যে জীবনব্যবস্থায় এরই মধ্যে মানুষ অভ্যস্ত, তা কি ভৌগোলিক দূরত্ব বা নৈকট্য— উভয়কেই অর্থহীন করে তোলেনি? পৃথিবীর জনবহুল শহরগুলোতে কানে এয়ারফোন, হাতে মোবাইল ফোন ধরা মানুষগুলো আসলে প্রত্যেকে ‘একা’। ডিজিটাল স্ক্রিনে স্ক্রিনে নিবদ্ধ চোখের মানুষের ভিড়ে একজনের ঘাড়ে অন্যের নিঃশ্বাস পড়লেও তার হলকা অনুভূত হয় না। পাশের ফ্ল্যাটের মানুষটিকে আমরা চিনি না পর্যন্ত। এর চেয়ে বড়ো বিচ্ছিন্নতা আর কী হতে পারে? চিরকালীন যে ঐক্য-একতার চেতনায় মানবসমাজ রচিত, তার এমন ভগ্নদশা কে কবে দেখেছে? এর বিপরীতে করোনার বিরুদ্ধে যে লড়াই, তা আসলে প্রত্যেকের উপস্থিতি উপলব্ধির। নিজেকে ঘরবন্দি রাখব নিজের জন্য তো বটেই, আমার এই সঙ্গনিরোধ বা বিচ্ছিন্নতা অন্যের জন্যও সমান দরকারি। অন্যের জন্য নিজের গুরুত্বের এমন মাহাত্ম্য নিয়ে এসেছে এই করোনাকাল এবং এই গুরুত্ব নির্ধারণে ধনী-নির্ধনে ফারাক নেই, ভিন্নতা নেই সাদা-কালোয়। এমনই ‘সার্থক সাম্য’ প্রতিষ্ঠার সুযোগ এসেছে আজ পৃথিবীতে।
অন্যের প্রতি অবিশ্বাস নিয়ে বিচ্ছিন্নতার নীতিতে এই লড়াইয়ে জেতা যাবে না। প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তার নামের রাষ্ট্রকেন্দ্রিক দর্শন যে কতটা অসাড়, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রভান্ডারের মালিক দেশটিও যে কতটা অসহায়, করোনা তার হাতেকলমে শিক্ষা। এই শিক্ষার সারকথা, জিততে হলে লাগবে পারস্পরিক সহযোগিতা, ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য। সময় এখন ভালোবাসার-বিশ্বাসের-ভরসার বেষ্টনী দিয়ে পৃথিবী ঘিরে ফেলার; একে অপরের দিকে হাত বাড়িয়ে দেওয়ার—মানুষে-মানুষে, দেশে-দেশে।
n লেখক :সাংবাদিক
hello.hasanimam@gmail.com