কে লাগাম টানিবে বিশ্বের বৃহত্তম ঘাতকের?

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বত্সর কত মানুষ মারা যায়—তাহার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নাই। জাতিসংঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, ২০০০ সালে বিশ্বে মৃত্যুর শীর্ষ ১০টি কারণের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনার স্থান ছিল দশম। ২০১৬ সালে তাহা অষ্টম স্থানে চলিয়া আসিয়াছে। আর ২০৩০ সাল নাগাদ ইহা সপ্তম স্থান দখল করিবে। অন্যদিকে পপুলেশন রেফারেন্স ব্যুরোসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর এই ধারা যদি অব্যাহত থাকে, তাহা হইলে ২০২০ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর কারণ হিসাবে সড়ক দুর্ঘটনা তৃতীয় স্থানে চলিয়া আসিবে।

তবে বিশ্বব্যাপী তরুণদের মৃত্যুর সবচাইতে বড় কারণ কী—এমন প্রশ্নের উত্তরে সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) জানাইয়াছে অবাক করা একটি তথ্য। তাহাদের পরিসংখ্যান বলিতেছে, পথ-দুর্ঘটনার কারণে বিশ্বব্যাপী সবচাইতে বেশি তরুণ জনগোষ্ঠী অকালে প্রাণ হারাইতেছে। হু-এর রিপোর্টে সড়ক দুর্ঘটনাকে উল্লেখ করা হইয়াছে, ‘বৃহত্তম ঘাতক’ হিসাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘গ্লোবাল স্ট্যাটাস রিপোর্ট ২০১৮’ হইতে জানা যায় যে, ট্রাফিক-সংক্রান্ত কারণে ২০১৬ সালে বিশ্বজুড়িয়া সাড়ে ১৩ লক্ষ তরুণ প্রাণ হারাইয়াছেন, যাহাদের বয়স ৫ হইতে ২৯ বত্সরের মধ্যে। হু-এর এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, প্রতি লক্ষমানুষে গড়ে ২৬ দশমিক ৬ জনের মৃত্যু হয় পথদুর্ঘটনায়। সম্প্রতি ভারতীয় উপমহাদেশের একটি বৃহত্ গাড়ি নির্মাণ সংস্থা মানুষের ট্রাফিক-সচেতনতা সম্পর্কে একটি সমীক্ষা চালায়। সমীক্ষায় দেখা যায় যে, গড়ে ৪৫ শতাংশ মানুষই গতিসীমা কিংবা নির্দিষ্ট লেন মানিয়া গাড়ি চালাইতে রাজি নহে। জেব্রা ক্রসিংয়ে গাড়ি থামাইয়া পথচারীদের রাস্তা পারাপারে সহযোগিতা করিতে নারাজ গড়ে ৩৬ শতাংশ চালক। এমনকী চালকের বয়স নির্দিষ্ট বয়ঃসীমা হইতে কম হয়, তাহাতেও আপত্তি নাই বেশিরভাগ মানুষের। সুতরাং ২০১৮ সাল জুড়িয়া যে বিশ্বের বৃহত্তম ঘাতক দাপটের সহিত রাজত্ব করিয়াছে, তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না।

এমনিতেই গত বত্সর তাহার আগের বত্সরের তুলনায় বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পাইয়াছিল ২২ শতাংশ। অথচ জাতিসংঘের বৃহত্তর সদস্য দেশগুলির মধ্যে বাংলাদেশও অঙ্গীকার করিয়াছে, ২০১১ হইতে ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামাইয়া আনিবে। প্রশ্ন হইল যে, এই ১০ বত্সরে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামাইয়া আনিবার মতো কার্যকরী পদক্ষেপ কি বাংলাদেশ গ্রহণ করিয়াছে? বাংলাদেশে ‘দুর্ঘটনা’ বা ‘অ্যাক্সিডেন্ট’ শব্দ সম্পর্কে একটা মিথ সৃষ্টি করা হইয়াছে যে, ইহা যেন দৈবদুর্বিপাক! সড়ক দুর্ঘটনা লইয়া বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের আন্দোলন-কর্মসূচি পালন করা হইয়াছে। কয়েক মাস পূর্বে কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীরা অভূতপূর্ব আন্দোলন করিয়াছে। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় তাহাতে বিশেষ ভাটা পড়ে নাই। আমরা বারংবার বলিয়াছি, সর্বক্ষেত্রেই নিয়ম-শৃঙ্খলা মানিয়া চলিতে হইবে অত্যন্ত কঠোরভাবে। ইহার ব্যত্যয় ঘটিলে সেইখানে বিবিধ সমস্যা বিস্তার লাভ করিবেই। সার্বিকভাবে সড়ক দুর্ঘটনার একটি স্থায়ী সমাধান পাইতে হইলে বিশেষজ্ঞদের গবেষণালব্ধ মতামত ও পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। নচেত্ বিশ্বের বৃহত্তম ঘাতককে আমরা অত্যাসন্ন নূতন বত্সরেও সহজে কাবু করিতে পারিব না।