তারুণ্যের ভোটেই বিজয়ী হবে উন্নয়নধারা

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে দেখা গেছে তারুণ্যের জোয়ার। এক জরিপে দেখা যায়, সেখানে ৪০ শতাংশ তরুণই এবার ভোট দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল। বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও সেই তারুণ্যের হাওয়া।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ। তারুণ্যের সম্মিলিত শক্তি একটি সমাজের আমূল পরিবর্তন করে দিতে পারে। আমরা ২০১৩তে শাহবাগ আন্দোলনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে সেই তারুণ্যের দাপট দেখেছি। এই তারুণ্যশক্তির সিংহভাগই এবারের ভোটার।

নতুন ভোটাররা বয়সে তরুণ হলেও বুদ্ধিতে তরুণ নয়। প্রযুক্তি তাদের হাতের মুঠোয়। তারা কারো সাহায্য ছাড়াই তাদের জন্মের আগের তথ্যরাজ্যে এক নিমেষেই ঘুরে আসতে পারে। তারা আঙুলের একটু স্পর্শে সহজেই জানতে পারে বিশ্ব পরিস্থিতি, উন্নতি-অবনতি। সুতরাং তাদের ধোকা দেওয়ার সুযোগ খুব কম। আবার কোন সরকার দেশটা কতটুকু এগিয়ে নিয়ে গেছে কিংবা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার শক্তি রাখে—এটাও তারা প্রযুক্তির মাঝেই দেখতে পায়।

যুদ্ধাপরাধীদের-জঙ্গিদের কারা প্রশ্রয় দেয়, কারা স্বাধীনতা বিরোধীদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দিয়ে সারাদেশকে স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াত-শিবিরের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছিল, কারা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে সংখ্যালঘু নির্যাতন, দশ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, দেশব্যাপী জঙ্গিবাদের বিস্তার জনজীবনকে আতঙ্কগ্রস্ত ও দুর্বিষহ করে তুলেছিল এবং খাম্বার ব্যবসা করে শত শত কোটি টাকা মুনাফা হাতিয়ে নিলেও বিদ্যুতের অভাবে মানুষকে হাহাকার করতে হয়েছে। কাদের আমলে সারের জন্য কৃষককে জীবন দিতে হয়েছে। এসব তারুণ্যের এই শক্তিকে দেখিয়ে দিতে হয় না, প্রযুক্তির কারণে বরং তারাই গড়গড় করে বলে দিতে পারে সব।

এবারের নির্বাচনে বিজয়ী হতে তরুণদের ভোট সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে। সারাদেশে এবার ১৮ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে বয়সের মোট ভোটারের সংখ্যা দুই কোটি ৩১ লাখ। সরল হিসেবে ৩০০ আসন দিয়ে এই ভোটার সংখ্যাকে ভাগ করলে আসন প্রতি ভোটার সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৭ হাজার। সারাদেশের মোট ভোটারের সংখ্যা ১০ কোটি ৪১ লাখ ৯০ হাজার ৪৮০ জন। অর্থাত্ ভোটারদের একটি বড় অংশই হচ্ছে তরুণ ভোটার। তারুণ্যের এই ভোট যারা পাবেন বিজয় তাদের সুনিশ্চিত। এই হিসেবেই দায়িত্বশীল বিভিন্ন সংগঠন বারবার তরুণ ভোটারদের ভুল না করার আহ্বান জানাচ্ছেন।

অতিসমপ্রতি রাজধানীতে তারুণ্যের ভোট ভাবনায় এক গোলটেবিল আলোচনায় আশা প্রকাশ করে বলা হয়, এবার তরুণদের প্রথম ভোট হবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। সারাদেশে তরুণদের ঘিরে গত ১০ বছরে যত উন্নয়ন হয়েছে তা অতীতে কোনোদিন হয়নি। ফলে তরুণরা নিজেদের আরও এগিয়ে নিতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ভোট দেবে। সত্যের মাধ্যমেই তরুণদের সঠিক পথে রাখা যাবে। এই সত্য জানার পথে সব বাধা অতিক্রম করতে হবে। সত্যের মাধ্যমেই সঠিক নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে যাবে। সারাদেশ যেভাবে ডিজিটালাইজড হয়েছে তাতে দেশ তথা তরুণরা এগিয়ে যাচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের মাধ্যমেই তরুণরা তাদের চেতনা এগিয়ে নেবে, এটাই তো ছিল আওয়ামী লীগ তথা এই সরকারের চাওয়া।

বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, তরুণ উদ্যোক্তা সৃষ্টিসহ কর্মসংস্থানের সব ধরনের ব্যবস্থাই করা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নের যে ট্রেনটি দ্রুতবেগে ছুটে যাচ্ছে এই ট্রেন থেকে তরুণরা নেমে যাবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে থাকবে না এটা হতে পারে না। অবশ্যই বর্তমান সরকারের প্রতি এই তরুণরা আস্থা রাখবে এবং দেশকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে।

ছাত্র বা বেকার তরুণ যারা আমাদের ভবিষ্যত তারা সবাই এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চায় যা হবে উন্নত, কর্মমুখর ও সহিংসতামুক্ত সোনার বাংলাদেশ। দুর্নীতি, সহিংসতা ও জঙ্গীবাদ বাংলাদেশের সমৃদ্ধির পথে বড় বাধা বলে মনে করে তরুণরা। তারা এমন জনপ্রতিনিধিকে ভোট দিতে চায় এবং এমন সরকার দেখতে চায় যে সরকার তাদের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে সক্ষম হবে, যে সরকার তাদের দাবিকে প্রাধান্য দিবে এবং তাদের অগ্রযাত্রায় সক্রিয় অংশীদার হবে তরুণরা তাকেই বেছে নেবে। এসব বিবেচনায় তারুণ্যের মেধা, শ্রম এবং দক্ষতা কাজে লাগিয়ে সোনার বাংলা গঠনই হতে হবে আগামীর নির্বাচিত সরকারের মূল লক্ষ্য। এই অঙ্গীকার নিয়ে যে প্রার্থী বা দল নির্বাচনে অংশ নেবে এবং যারা তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি এরই মধ্যে রক্ষা করেছেন তাদেরই তারুণরা তাদের মূল্যবান ভোট দিয়ে বিজয়ী করবে। তরুণদের এই চাওয়া পূরণ হতে পারে কাকে বিজয়ী করলে আজকের বুদ্ধিদীপ্ত তারুণ্যকে তা বলে দিতে হবে বলে অন্তত আমি মনে করি না।

অনেকেই বলছেন, এবার তারুণ্যের প্রথম ভোট মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে হোক। আমি বিশ্বাস করি, তারুণ্যের প্রথম ভোটটি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই হবে। কারণ আমি দেখেছি দেশপ্রেমে ও দেশজ চেতনায় কখনো কখনো তরুণরা আমাদের চেয়েও এগিয়ে। একটি দেশ তখনই এগিয়ে যায়, যখন দেশ একটি শুভ শক্তির নেতৃত্বে থাকে। সেই শুভ শক্তির নেতৃত্বে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথ আরও প্রশস্ত হয়। উন্নয়নের গতি আরও বেড়ে যায়। বাংলাদেশের তারুণ্য এখন প্রযুক্তির ছোঁয়ায় উদ্ভাসিত। তারুণ্য পরিবর্তনের ধারা তৈরি করে। যে-কোনো সাহসী কার্যক্রমে তারা জেগে ওঠে। যেদিকে তারুণ্য এগিয়ে যায় সেদিকেই সাড়া জাগে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বড় শক্তি ছিল তারুণ্য। সেই চেতনাকে ধারণ করে বেড়ে উঠছে আমাদের নতুন প্রজন্ম। নিত্যনতুন প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে তারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে। তাই আগামী নির্বাচনে তরুণরা সেই শুভ শক্তির, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী দলকেই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে। আমি বিশ্বাস করি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসামপ্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে তরুণরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

রাজনীতির মাঠে চলছে এখন সত্য-মিথ্যার লড়াই। মানুষকে বোকা বানানোর খেলা চলছে। মিথ্যা বলে তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চলছে। তাই এই মিথ্যাবাদীদের প্রত্যাখ্যান করতে হবে। তাদের সত্য খুঁজে দেখতে হবে। রাজনীতিবিদদের দোষ দিলে চলবে না, নাগরিক হিসেবে সত্যের পক্ষে ভোট দিতে হবে। তরুণদেরই দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। আমি আস্থাবান, তরুণরা সেটাই করবে।

তরুণ প্রজন্ম সবসময় সামনের দিকে এগিয়ে যায়। ভোটের মধ্যদিয়ে সবাই উন্নয়নকে এগিয়ে নেবে এমন সরকার দেখতে চায়। বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার তারুণ্য দীপ্ত নেতৃত্বে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় আজকের বাংলাদেশ। যারা প্রগতি ও প্রবৃদ্ধির কথা চিন্তা করছে তারা শেখ হাসিনার সঙ্গে থাকছে। দেশকে পুঁথিগত নয়, বাস্তব উন্নয়নের ধারায় তিনি নিয়ে এসেছেন। তাই নতুন ভোটারদের দেশকে এগিয়ে নিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একটি ভুল সিদ্ধান্তে থমকে যেতে পারে দেশের উন্নয়নের বিজয় নিশান। ভুল সিদ্ধান্ত নিলে সাফল্যের অগ্রযাত্রায় তৈরি হবে প্রতিবন্ধকতা।

আমরা আমাদের আত্মসম্মানবোধ ফিরে পেয়েছি। এদেশের এখনকার তরুণরা আত্মসম্মানের চিত্র দেখেছে। আজকে একটি প্লাটফর্ম তৈরি হয়েছে। আর এই দেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এদেশের তরুণরাই ডিজিটাল বাংলাদেশের আলোকবর্তিকা। পদ্মা সেতুসহ যত অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে বা হচ্ছে এগুলো আমাদের দেশের আত্মসম্মানবোধকে বাড়িয়ে দিয়েছে।

বিগত কয়েক বছরে আমরা অনেক উন্নয়ন দেখেছি। উন্নয়ন যা হচ্ছে সেটা শুধু আমাদের জন্য নয়, এটা থেকে যাবে নতুন প্রজন্মের জন্যও। তরুণরা দেশের ভবিষ্যত্। আমাদের মতো তরুণরা যত সক্রিয় হবে দেশ ততটাই এগিয়ে যাবে। দেশের উন্নতি হলে, দেশ এগিয়ে গেলে এগিয়ে যাবো আমরাও। এ উন্নয়নের হাতিয়ার তারুণ্য। তারুণ্য জেগে উঠলেই এগিয়ে যাবে আমাদের বাংলাদেশ।

বাংলাদেশকে বলা হচ্ছে, এশিয়ার ইমার্জিং টাইগার। এখন ক্রিকেটেও আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। এটাও তারুণ্যেরই জয়। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি- যে শক্তি মুক্তিযুদ্ধ, এসডিজি ও টেকসই উন্নয়নের কথা বলবে, তরুণরা সেই শক্তির পক্ষ নেবে। তরুণরা বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের সম্মান ও মর্যাদা বাড়াবে। অন্যদিকে উন্নয়নের শত্রুকেও আজ চিহ্নিত করা জরুরি। উন্নয়নের পক্ষে ভোটের মাধ্যমেই উন্নয়নের শত্রুকে বিদায় জানাতে হবে। আর সে দায়িত্বটিও নেবে আজকের এ তারুণ্য। জয় হোক তারুণ্যের। জয় হোক মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশের।

n লেখক: শিক্ষাবিদ ও রাজনীতি বিশ্লেষক