বাজিতেছে অদৃশ্য রণডঙ্কা

 ‘এতটা নিঃশব্দে জেগে থাকা যায় না, তবু জেগে আছি...আরো কত শব্দহীন হাঁটবে তুমি, আরো কত নিভৃত চরণে/ আমি কি কিছুই শুনবো না—আমি কি কিছুই জানবো না!’ প্রায় পাঁচ দশক আগে প্রয়াত কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাহার কবিতায় ব্যক্ত করিয়াছিলেন। নিঃসন্দেহে কবিতার বিষয়বস্তু করোনা ভাইরাস ছিল না। কিন্তু তাহার এই পঙিক্তগুলি আজ অদৃশ্য ভাইরাসের জন্য প্রাসঙ্গিক হইয়া উঠিয়াছে। নিস্তব্ধ ঢাকা, নিস্তব্ধ দেশ, এমনকি নিস্তব্ধ হইয়া গিয়াছে গোটা বিশ্ব। থমকাইয়া দিয়াছে মানবসভ্যতাকে। অদৃশ্য এক দানব ঘরবন্দি হইতে বাধ্য করিয়াছে। যদিও এইভাবে ঘরবন্দি হইয়া থাকা মানুষের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। তবুও  গোটা বিশ্বের মানুষ জানে, আপাতত থাকিতে হইবে ঘরবন্দি। কোলাহলে মুখরিত হইতেছে না তিলোত্তমা শহর, সড়কে বাজিতেছে না ভেঁপু, আকাশে মানুষের বাহন মেলিতেছে না ডানা, নদী সন্তরণে নামিতেছে না নৌকা-জাহাজ। কেবলই শার্সিতে মুখ রাখিয়া শতশত কোটি মানুষ অপেক্ষা করিতেছে, মুক্তি আসিবে কবে; ভাবিতেছে, কতদিন? কতদিন মানুষের এই জনপদকে তাড়া করিবে মহামারি-মৃত্যু!  এখনো তাহা মানুষের জানা নাই।

ঘরবন্দি মানুষের অবাধ জীবনাচারই যে কেবল ব্যাহত হইতেছে তাহা নহে, তৃতীয় বিশ্বের মানুষের জন্য আরো তীব্র বিপদের রণডঙ্কা বাজিতেছে। এই সকল দেশে ক্ষুধার রূপ লইয়া মৃত্যু আসিয়া প্রবেশ করিতে পারে ঘরে ঘরে। ১৯টি স্বাধীন দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সংগঠন অক্সফ্যাম জানাইয়াছে, বিশ্বের ৫০ কোটি মানুষ হতদরিদ্র অবস্থায় নিপতিত হইবে। জাতিসংঘ খাদ্য রপ্তানিকারক দেশগুলিকে এখনই সরবরাহ বন্ধ না করিতে অনুরোধ জানাইয়াছে। তবে সেই সঙ্গে হুঁশিয়ার করিয়াছে বিশ্বব্যাপী—আগামী দিনে খাদ্যসংকটের আশঙ্কা রহিয়াছে। অনুমেয়, বিশ্বের উন্নত দেশগুলি তাহাদের সরবরাহ মিটাইতে পারিবে, কিন্তু খাদ্য অপ্রতুল এবং আমদানিনির্ভর দেশগুলি মহা বিপদে পড়িতে পারে। বর্তমান সমস্যা কোনো সাধারণ সমস্যা নহে। কোনো একটি দেশ এই যুগে সাধারণ দুর্ভিক্ষে পতিত হইলে অন্য দেশ হইতে সরবরাহ পৌঁছাইয়া যায়। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং উন্নত দেশের সাহায্য পৌঁছাইয়া যায়। কিন্তু এই করোনা ভাইরাসের যুগ আতঙ্কিত করিয়াছে ধনী-দরিদ্র সকল দেশকেই। কে দিবে কাহাকে সাহায্য! উন্নত বিশ্বে এই ভাইরাসের যে ধকল যাইতেছে, তাহাতে অন্য কাহারো দিকে চোখ ফিরাইবার ফুরসত তাহাদের নাই।

সুতরাং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাবধান হইতে হইবে নিজেদেরই। কোনোভাবেই যেন অর্থ ও  খাদ্যের অপচয় না হয় সেই দিকে ব্যক্তিগত জীবনে ও রাষ্ট্রীয় পর্যায় সতর্ক হইতে হইবে। চোখ-কান খোলা রাখিতে হইবে, এক মাস বা দুই মাস নহে, আরো দূরের দিকে দৃষ্টি রাখাই হইবে দূরদর্শিতা। গৃহবন্দি মানুষের জন্য সীমিত সামর্থ্য লইয়া বাংলাদেশের সরকার আপ্রাণ চেষ্টা চালাইয়া যাইতেছে, ইহাতে কোনোই সন্দেহ নাই। কিন্তু সেই সঙ্গে এই অবস্থা কতদিন চলিবে, কী ধরনের সংকট সামনের দিনে মোকাবিলা করিতে হইবে, অর্থসংস্থানের উত্স কী হইবে—এই সকল বিষয় বাস্তব পরিকল্পনা লইয়াই আগাইতে হইবে।