ওজোন স্তর পৃথিবীর জন্য কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তাহা মাধ্যমিক স্তরের একজন স্কুলশিক্ষার্থীও জানেন। সম্প্রতি সেই ওজোন স্তরের বিশাল গর্ত দেখা গিয়াছে সুমেরুর মাথার ওপর! এই গর্ত বড়ো হইতে হইতে সুমেরু হইতে গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত চলিয়া গেলে পৃথিবীর জন্য তাহা অভাবিত ক্ষতির কারণ হইয়া উঠিতে পারে। ওজোন স্তর কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তাহা বুঝিতে এককথায় বলা যায়—এই স্তর ব্যতীত পৃথিবীর জীবজগত্ টিকিয়াই থাকিতে পারিত না। জীবজগত্ টিকিয়া থাকিবার মতো সকল ধরনেরই সুরক্ষাবলয় দিয়া থাকে ওজোন স্তর। পৃথিবীর ছয় মাইল উচ্চতায় অবস্থিত ওজোন স্তর সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি হইতে আমাদের সুরক্ষা দেয়। কেবল তাহাই নহে, বিশ্বের উষ্ণায়ন প্রতিহত করিতেও ওজোন স্তরের বিশেষ ভূমিকা রহিয়াছে। কারণ, অতিরিক্ত অতিবেগুনি রশ্মির প্রবেশ রুখিয়া দিয়া পৃথিবীর তাপমাত্রা অতিরিক্ত বৃদ্ধির পথ রুদ্ধ করিয়া দেয় ওজোন স্তর। অন্যদিকে, মাত্রাতিরিক্ত অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে মানুষ ও বিভিন্ন প্রাণীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হইয়া যায়। এই রশ্মি কোষের সৃষ্টি এবং বৃদ্ধিকে ব্যাহত করিয়া থাকে এবং অনেক ক্ষেত্রে কোষগুলোকে ভাঙিয়াও ফেলে। গবেষকদের মতে, পৃথিবীর ওজোন স্তর মাত্র ৫ শতাংশ ক্ষতি হইবার কারণে সারা বিশ্বে ৫ লক্ষাধিক মানুষ ত্বকের ক্যানসারে ভুগিতেছেন। তাহা ছাড়া অল্পবয়সে চোখে ছানি এবং নখ ও চুলের ক্ষতিসাধন করিয়া থাকে এই অতিবেগুনি রশ্মি।
বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর সুরক্ষা চাদর ওজোন স্তর ক্ষতিগ্রস্ত করিবার ক্ষেত্রে প্রধান অপরাধী ক্লোরোফ্লুরোকার্বন নামক এই রাসায়নিক যৌগটি। ক্লোরোফ্লুরোকার্বনটি পরিবেশে ছাড়িতেছিল পুরাতন প্রযুক্তির এয়ার কন্ডিশনার, রেফ্রিজারেটর, কম্পিউটার ও অন্যান্য যন্ত্রের সার্কিট, ফোম শিল্প, রং শিল্প, প্লাস্টিক শিল্প, সুগন্ধি শিল্প, ট্যানারির বিভিন্ন বর্জ্যপদার্থ। ১৯৮০ সালে প্রথম ওজোন স্তর ক্ষতির কথা জানা যায়। বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় ব্যাপক পরিকল্পনায় শুরু হয় সেই ক্ষত সারাইবার কাজ। ১৯৮৭ সালে কানাডার মন্ট্রিলে পৃথিবীর ১৮০টি দেশ ‘মট্রিল চুক্তি’তে স্বাক্ষর করে। ইহার পরে ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে হয় ধরিত্রী সম্মেলন। এই সম্মেলনে নেওয়া ‘এজেন্ডা ২১’-এর লিপিবদ্ধ বিষয়গুলিও ওজোন স্তর মেরামতের পথ সুগম করে। আশা করা যায়, উত্তর গোলার্ধের অংশটির ওজোন স্তর পুরোপুরি ঠিক হইবে ২০৩০ সাল নাগাদ, অন্যদিকে এন্টার্কটিকা অংশে সময় লাগিয়া যাইবে ২০৬০ অবধি।
যদিও বিজ্ঞানীরা আশা করিতেছেন, কিছুদিনের মধ্যেই বায়ুম্ললের স্বাভাবিক নিয়মে মিলাইয়া যাইতে পারে ওজোন স্তরের নূতন সৃষ্ট এই গর্তটি। তবে করোনাভাইরাস আমাদের বুঝাইয়া দিয়াছে বিশ্বের কোনো সমস্যাই নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলের একার নহে। জলবায়ু পরিবর্তন, বিশ্বায়ন, ওজোন স্তরের গর্ত হইবার মতো ঘটনার প্রভাব পড়িতেছে বিশ্ব জুড়িয়াই। এই ধরিত্রীকে বাঁচাইতে সম্মিলিতভাবে আমাদের আরো শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে।