চীনের থেকে ব্রিটেনের ক্ষতিপূরণ আদায়ের প্রস্তাব

ব্রিটেনকে করোনা ভাইরাসের ক্ষতিপূরণ হিসেবে চীনের কাছ থেকে ৩৫ হাজার ১০০ কোটি মার্কিন ডলার আদায়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রাক্তন উপ-প্রধানমন্ত্রী ড্যামিয়ান গ্রিনের নেতৃত্বে গঠিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এক কমিটির রিপোর্টে এই প্রস্তাব করা হয়। এতে বলা হয়, করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ও যথাযথ তথ্য প্রদানে ব্যর্থ হওয়ায় চীন এই ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য। অন্যথায় বৃটেনকে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক কাউন্সিল অব জুরিস্ট (আইসিজে) বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ করোন ভাইরাস ছড়িয়ে দেওয়ার মতো গুরুতর অপরাধ করার জন্য চীনের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। মারাত্মক এই ভাইরাসে সারাবিশ্বে লাখ লাখ লোক মারা গেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে লন্ডনভিত্তিক আইসিজের সভাপতি এবং অল ইন্ডিয়া বার অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান আদিশ সি আগরওয়ালা এই অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে কোভিড-১৯ ছড়িয়ে দিয়ে মানবতাবিরোধী ধ্বংসযজ্ঞের জন্য চীনকে ক্ষতিপূরণ দানে বাধ্য করতে বিশ্বসংস্থার তাত্ক্ষণিক হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়। এর আগে চীনে করোনা ভাইরাসে মৃত্যু শুরু এবং বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে গত ২৮ শে জানুয়ারি বেইজিংয়ে চীনের গ্রেট হলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস অ্যাধনম ঘেব্রেয়িয়াস এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে  ‘করোনা ভাইরাস’ ছড়িয়ে পড়া রোধ করার উপায় নিয়ে তারা আলোচনা করেন।

চীনা কর্তৃপক্ষ অবশ্য স্বীকার করেছে, রহস্যজনক নতুন রোগটি মানুষের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এর প্রেক্ষিতে ওই সব ডাক্তারকে আটক করা হয়, যারা প্রাথমিকভাবে নাগরিকদের সতর্ক করার চেষ্টা করতে ব্যর্থ, গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি উপেক্ষা এবং বাইরের বিশেষজ্ঞদের মতামত প্রত্যাখ্যান করে। এই টেড্রোসই, কিছু দিন আগে ডব্লিউএইচও’কে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে বাধা দিয়েছিলেন। তার কারণেই চীনের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি। বরং তিনি ‘বিরল’ নেতৃত্বের জন্য শি জিনপিং এবং ‘স্বচ্ছতার’ জন্য চীনের প্রশংসা করেন। পরে তিনি ঘোষণা করেন, দেশটি মহামারির প্রাদুর্ভাব রোধে রোগ শনাক্তকরণের উন্নত পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে এবং বিশ্বের মানুষকে রক্ষার জন্য তারা অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য। যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকান সিনেটর মার্কো রুবিও বিষ্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, সংস্থাটি চীনা মিথ্যাচার নিয়ে জনগণের সঙ্গে ‘কৌতুক’ করেছে। তিনি টেড্রোসের বিরুদ্ধে পক্ষপাতেরও অভিযোগ আনেন। নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে ডক্টরেটপ্রাপ্ত এই ইথিওপিয়ান এর আগে আফ্রিকার দমনমূলক শাসন ব্যবস্থার একজন সিনিয়র ব্যক্তিত্ব ছিলেন বলে অভিযোগ আছে। তবে তিনি বরাবরই বেইজিংয়ের শক্তিশালী সমর্থক এবং ইথিওপিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রী থাকাকালে বিতর্ক সত্ত্বেও চীনের সমর্থন নিয়ে ডব্লিউএইচও’র শীর্ষ পদ লাভ করেন। তিনি নিজ দেশে ২০০৬, ২০০৯ ও ২০১১ সালে কলেরা মহামারি আকারে ছড়ানোর দাবির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। জাপানের উপ-প্রধানমন্ত্রী তারো আসোও টেড্রোসের সমালোচনা করেছেন। তিনি জনস্বাস্থ্য রক্ষায় টেড্রোসের ব্যর্থতার জন্য এবং বেইজিংকে সমর্থন করে ডব্লিউএইচও’কে হেয়প্রতিপন্ন করার কথা উল্লেখ করে বলেন, এখন এর নামকরণ করা উচিত ‘চীনা স্বাস্থ্য সংস্থা’। চীনা সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন দাবিও করা হয়েছে যে, উহানের একজন সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ এশিয়ার একজন ডব্লিউএইচও কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। শিক্ষাজীবনে তারা একসঙ্গে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন এবং একে অপরের মিত্র বলে পরিচিত ছিলেন। এদিকে এই দুর্যোগের ওপর ব্রিটেনের প্রাক্তন উপ-প্রধানমন্ত্রী ড্যামিয়ানের নেতৃত্বে রক্ষণশীল দলের ১৫ জন সিনিয়র সদস্যের তদন্ত কমিটি বরিস জনসনকে লেখা এক পত্রে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা ও পুনর্মূলায়নের দাবি জানিয়েছেন। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে করোনা ভাইরাসের প্রভাব সম্পর্কে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে যে সাত-জাতির শীর্ষস্থানীয় অর্থনৈতিক গোষ্ঠী (জি-৭) ৩২০ ট্রিলিয়ন ডলার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। তবে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি গত বছরের শেষের দিকে এই প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে সঠিক ও স্পষ্ট তথ্য দিলে এই  ক্ষতি এড়ানো যেত।

‘করোনা ভাইরাস ক্ষতিপূরণ’ শীর্ষক ওই তদন্ত প্রতিবেদন (রিপোর্ট)’টি বুধবার ৮ এপ্রিল প্রকাশিত হয়। ড্যামিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, আইনি পদক্ষেপ হিসেবে ব্রিটেনের উচিত আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার জন্য চীনের বিরুদ্ধে হেগের সালিশি আদালত, আন্তর্জাতিক আদালত বা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় মামলা দায়ের করা। ড্যামিয়েন এবং তার সঙ্গীরা বলেন, চীন আন্তর্জাতিক চুক্তি মেনে না চলায় তারা উদ্বিগ্ন। তারা ব্রিটিশ সরকারকে সংকট থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার পর চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানান। তারা বলেন, ‘আমরা নিজেদের ক্রমশ চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠতে দিয়েছি এবং ব্রিটেনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং সুরক্ষার প্রয়োজনীয় কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি নিতে ব্যর্থ হয়েছি’। তবে ঊর্ধ্বতন সরকারি সূত্রের মতে বৈজ্ঞানিক পরামর্শের ভারসাম্য এখনো বজায় রয়েছে। মারাত্মক ভাইরাসটি প্রথমে উহানের একটি পশুর বাজার থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়েছিল। বরিস জনসনের জরুরি কমিটির এক সদস্য বলেন, সর্বশেষ অনুসন্ধানে জানা যায়, ভাইরাসটির প্রকৃত ‘জেনোটিক’ কোড এখনো উদ্ভাবন হয়নি। তবে এটা পরিষ্কার যে প্রাণী থেকে এই ভাইরাস উদ্ভূত এবং উহানের পরীক্ষাগার থেকেই ভাইরাসটি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। চীনের সবচেয়ে উন্নত পরীক্ষাগার ‘উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি’র অবস্থান মূল ভূখণ্ডে এবং কুখ্যাত ‘ওয়াইল্ড লাইফ’ বাজার থেকে ১০ মাইল দূরে। ৩০ মিলিয়ন ডলারের এই ইনস্টিটিউটটি বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ ভাইরোলজি ইউনিট বলে পরিচিত। ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা প্রথমে ধারণা দিয়েছিলেন যে এই ভাইরাসের ‘জিনোম’-এর সঙ্গে বাদুড়ের জিনোমের ৯৬ শতাংশ মিল রয়েছে। স্থানীয় প্রতিবেদনগুলোর মতে, ইনস্টিটিউটের কর্মীরাই প্রথমে সংক্রামিত হয়। পরে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ে।

২০০৪ সালে, একটি চীনা পরীক্ষাগার থেকে ফাঁস হয় যে একটি  গুরুতর তীব্র শ্বাস-প্রশ্বাসের সিন্ড্রোম (সারস) শুরু হয়েছে। এতে এক ব্যক্তির মৃত্যু এবং নয় জন সংক্রমিত হয়েছে। চীন সরকার এই তথ্য ফাঁস হওয়ার জন্য চীনা রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের পাঁচজন সিনিয়র কর্মকর্তাকে শাস্তি দেয়। দক্ষিণ চীন প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমীক্ষায় বলা হয়, সম্ভবত কোভিড-১৯ এর উদ্ভব হয়েছিল রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের মধ্যেই। জানুয়ারিতে ওয়াইল্ডলাইফ বাজারটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বেইজিং নিউজে ভাইরোলজি ইনস্টিটিউটের গবেষক হুয়াং ইয়ানলিংকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর মতো কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রকল্পগুলো ব্যবহার করে বেইজিং সারাবিশ্বে শুধু অংশীদার নয় বরং ক্লায়েন্টের রাজ্য তৈরি করছে। বিশ্বের অর্ধেক গাড়ি, ৮০ শতাংশ কম্পিউটার এবং ৯০ শতাংশ ফোন চীনে নির্মিত। দেশটি আন্তর্জাতিক সুরক্ষা ব্যবস্থার অনুপ্রবেশ এবং ইন্টারনেটের প্রকৃতি পরিবর্তনের জন্য প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।

n লেখক :সিনিয়র সাংবাদিক