ছাত্রী হোস্টেল :না খাইলেও খাওয়ার বিল দিতে হইবে কেন?

আজকাল লেখাপড়া বা ক্যারিয়ার গঠনের প্রয়োজনে দেশের দূরদূরান্ত হইতে ঢাকায় পাড়ি জমাইতেছেন অসংখ্য নারী। তাহাদের অনেকেরই যেমন আত্মীয়স্বজন থাকেন না, তেমনি কাহারো কাহারো থাকিলেও বিভিন্ন কারণে সেইখানে থাকা সম্ভব হইয়া উঠে না। তাহাদের থাকিবার জন্য ঢাকা শহরে একটি জায়গা প্রয়োজন। এই চাহিদাকে সম্মুখে রাখিয়া ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় গড়িয়া উঠিয়াছে দুই শতাধিক ছাত্রী হোস্টেল। এই সকল হোস্টেলে বসবাস করিতেছেন বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত ও শিক্ষানবিশ নারীসমাজ; কিন্তু তাহাদের সমস্যার অন্ত নাই। প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় তাহাদের জিম্মি করিয়া প্রায়শ অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। এই করোনা দুর্যোগকালেও একশ্রেণির হোস্টেল ব্যবসায়ী তাহাদের উপর আজ খড়গহস্ত। গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি খবরে বলা হইয়াছে যে, এখন হোস্টেলে না থাকিলেও খাওয়ার বিল দেওয়ার জন্য কিছু কিছু ছাত্রী হোস্টেলের তত্ত্বাবধায়ক ছাত্রীদের অতিষ্ঠ করিয়া তুলিতেছে। করোনা পরিস্থিতিতে অনেকেই হোস্টেল ছাড়িয়া বাড়ি চলিয়া গিয়াছেন। যেখানে তাহারা হোস্টেলে অনুপস্থিত, সেখানে এই সময়ের খাওয়ার বিল চাওয়া হইবে কেন? বিষয়টি সত্যি অন্যায় ও অমানবিক।

অনেক ছাত্রী আছেন যাহারা এপ্রিল মাসের সিটভাড়া বিকাশের মাধ্যমে পাঠাইতে চাহিতেছেন; কিন্তু সিটভাড়ার সহিত খাবারের টাকাও দাবি করা হইতেছে অযৌক্তিকভাবে। এমনকি অর্ধেক টাকা দিতে চাহিলেও কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হইতেছে না। টাকা না পাঠাইলে রুমে রাখা জিনিসপত্র বাহির করিয়া অন্যকে রুম ভাড়া দেওয়া হইবে মর্মে হুমকি প্রদান করা হইতেছে। স্বভাবতই গ্রামেগঞ্জে গিয়া এই সকল ছাত্রী চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাইতেছেন। যেখানে এই মহাদুর্যোগকালে অনেক বাড়ির মালিক মানবিকতার পরিচয় দিয়া ভাড়াটিয়ার ভাড়া মওকুফ করিয়া দিতেছেন, সেখানে ছাত্রী হোস্টেলের মালিকরা একই নীতি অনুসরণ করিয়া সিটভাড়া মওকুফ করিয়া দিতে পারিতেন; কিন্তু তাহারা তাহা তো করিতেছেন না, উপরন্তু না খাইলেও খাওয়ার বিল দাবি করিতেছেন মামা বাড়ির আবদারের মতো। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের এক তথ্যমতে, রাজধানীতে প্রায় দেড় লক্ষ ছাত্রী রহিয়াছেন যাহারা বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। এই ছাত্রীদের বেশির ভাগই ঢাকার বাহির হইতে আসা। যেহেতু রাজধানীতে বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের হোস্টেল ও হল রহিয়াছে হাতেগোনা, তাই ব্যক্তিমালিকানাধীন ছাত্রী হোস্টেলগুলিই অনেকের শেষ ভরসা। আর এই সুযোগেই একশ্রেণির হোস্টেল মালিক একচেটিয়া ব্যবসা করিয়া যাইতেছে এবং যাহা ইচ্ছা তাহাই আচরণ করিতেছে।

রাজধানীর ফার্মগেট, মণিপুরীপাড়া, রাজাবাজার, গ্রিনরোড, আজিমপুর, মগবাজার, বকশীবাজার, নীলক্ষেত, মোহাম্মদপুর, আসাদগেট, ধানমন্ডি, জিগাতলা, লালমাটিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় রহিয়াছে এই সকল ছাত্রী হোস্টেল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির মৌসুমে অনেক ছাত্রী মফস্সল হইতে ঢাকায় কোচিং করিতে আসিয়া এই হোস্টেলগুলিতে ভিড় জমান। এই সময় হোস্টেল মালিকরা বেপরোয়া হইয়া উঠে বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে। অনেক হোস্টেলে নিম্নমানের খাবার, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, নিরাপত্তাহীনতা, ওয়াশরুমের সংকট ইত্যাদি বিদ্যমান। অতএব, এই সকল ছাত্রী হোস্টেলের সার্বিক পরিবেশ উন্নয়ন, অতিরিক্ত অর্থ আদায় বন্ধ এবং ছাত্রীদের আবাসনসংকট নিরসনে সরকারিভাবে আরো ছাত্রী হোস্টেল নির্মাণের দাবি জানাই আমরা। আমরা মনে করি, যেই সকল নারী জীবনে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য চারদেওয়ালের গণ্ডি ছাড়িয়া বাহির হইয়া আসিতেছেন ব্যস্ত নগরজীবনে, তাহাদের সকল প্রকার সমর্থন ও সহযোগিতা প্রদান করা আবশ্যক।