ড. এজাজ মামুন
আজকের হিসাব মতো বিশ্বব্যাপী ‘কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ১৮ লাখ অতিক্রম করেছে। আর এই প্রাণঘাতী মহামারি রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে কোভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাবের পর এত অল্প সময়ে এর সংক্রমণ আজ বিশ্বব্যাপী সবার ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন মানবিক বিপর্যয় সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক। সারা বিশ্বে এই রোগের ব্যাপক জনসচেতনতা থেকে আমরা কিছুটা হলেও এই রোগের লক্ষণ সম্বন্ধে জেনেছি। আর কীভাবে এটি এক রোগাক্রান্ত ব্যক্তি থেকে অন্য জনের কাছে সংক্রমিত হয় সে সম্বন্ধেও আমাদের কিছুটা হলেও ধারণা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই কোভিড-১৯ রোগটি মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ বা যোগাযোগ আর আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি বা নিঃশ্বাসের সঙ্গে যে ফোঁটা বা ড্রপলেট নির্গত হয় তার মাধ্যমে এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির দেহে ছড়ায়। বিজ্ঞানীরা এখন এও বলছেন কিছুটা হলেও এই রোগটি বায়ুবাহিত। এখন পর্যন্ত কোভিড-১৯-এর কোনো প্রতিষেধক বের হয়নি। এই রোগের সংক্রমণ ক্ষমতা, ইপিডেমিওলজির ভাষায় যাকে ‘আর নট (R0)’ বলা হয়, তা অত্যন্ত বেশি। কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী গড়ে ২ থেকে ২ দশমিক ৫ ব্যক্তিকে সংক্রমিত করতে পারে। অর্থাত্ এক ব্যক্তি প্রথমে ২ থেকে ২ দশমিক ৫ জনকে আক্রান্ত করে। আবার এই আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রতিজনে একই সংখ্যক ব্যক্তিকে আক্রান্ত করে। এমনি করে জ্যামিতিক হারে এই সংক্রমণ চলতেই থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না এই বলয়টি বাধাগ্রস্ত হয়। এই জ্যামিতিক সংক্রমণের দিকে আমরা যদি একটু দৃষ্টি দিই তাহলেই বুঝতে পারব এর ব্যাপকতা কত তীব্র। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে এই রোগের প্রাদুর্ভাবের প্রথম ২৯ দিনে কোভিড-১৯-এ আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৫ জন তা পরবর্তী ৪৭ দিনে বেড়ে হয়েছে ৩,১২,২৩৭ যা আমাদের যে কোনো হিসাব আর ভাবনার অতীত। সংক্রমণের ধরন, তীব্রতা আর সর্বোপরি এই রোগের ভয়াবহতা বিবেচনা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে শুরু করে প্রতিটি দেশ এই রোগপ্রতিরোধে নির্দিষ্ট কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছে, যাতে করে এই রোগের বিস্তার একটি সহনশীল অবস্থায় থাকে ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা সহজ হয়। অধিকাংশ দেশেই এই রোগটির প্রাদুর্ভাবের সম্ভাব্য বিস্তারের ধরন নির্ধারণে ইপিডেমিওলজিকেল কার্ভ বা ইপি কার্ভ বিশ্লষণকে প্রাধান্য দিচ্ছে যাতে করে কোভিড-১৯ আপত্কালীন জনস্বাস্থ্যনীতি তৈরি করা অনেকটা সহজ হয়। যেমন, সংক্রমণের হারকে এমন একটা পর্যায়ে রাখা যাতে করে কোভিড-১৯ আপত্কালীন সময়ে রোগীর সংখ্যা সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা যায় এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায়। এই ইপি কার্ভ দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হতে না দিয়ে একটি সক্ষমতার অবস্থায় রাখা যাতে দেশটি তার জনস্বাস্থ্য সেবার সক্ষমতা আর এই মহামারি রোগের রোগীর সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করা যায়। এখন পর্যন্ত যে সব দেশ কোভিড-১৯-এর সংক্রমণের তীব্রতা বা গতিকে সহনশীল অবস্থায় নিয়ে এসেছে সে সব দেশের মূল লক্ষ্যই ছিল এই ইপি কার্ভকে চেপ্টা (flatten) করা। বলা যায়, এই দেশগুলোর কোভিড-১৯ প্রতিরোধের শ্লোগানটি হলো ‘ইপি কার্ভকে চ্যাপ্টা করো’। আর কীভাবে এই কার্ভকে চেপ্টা করা সম্ভব? কোভিড-১৯-এর সংক্রমণ ও বিস্তারের ধরনকে বিবেচনা করে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা যেমন ঘনঘন সাবান দিয়ে নিদেনপক্ষে ২০ সেকেন্ড হাত ধোওয়া, মাস্ক ব্যবহার প্রভৃতির সঙ্গে সামাজিক দূরত্ব, আইসোলেশন বা বিছিন্নতা বজায় রাখা, লকডাউন, আক্রান্ত রোগীকে কোয়ারেন্টাইন বা সঙ্গনিরোধ, আর যতটুকু পারা যায় টেস্ট বা নমুনা পরীক্ষা করা যাতে আক্রান্ত রোগীকে সুস্থদের মধ্য থেকে পৃথক করা ও যথাযথ চিকিত্সার ব্যবস্থা করা যায়। মূলত এই বিষয়গুলো একত্রে একটি প্যাকেজ যার সঠিক বাস্তবায়ন ইপি কার্ভকে চ্যাপ্টা করতে পারে। টেস্ট করার আরো একটা প্রধান কারণ হলো—ভাইরাসটি কতটুকু বিস্তার লাভ করেছে তা জানা। যাতে করে এর মূল্যায়ন করে জনগণের চলাফেরা তথা আইসোলেশন, লকডাউন, কোয়ারেন্টাইন প্রভৃতি বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করা যায়। প্রতীয়মান হচ্ছে—যে সব দেশ যত বেশি টেস্ট করেছে সে সব দেশ কোভিড-১৯ প্রতিরোধে তত বেশি সক্ষমতা অর্জন করেছে, তাদের আপত্কালীন জনস্বাস্থ্য নীতিনির্ধারণে নিজেদের অবস্থানকে শক্ত করেছে। আর তাই অনেক দেশই কোভিড-১৯ টেস্টের একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে এবং এর জন্য কাজ করে যাচ্ছে। গত সপ্তাহের ডাটা থেকে দেখা গেছে—বেশ কিছু দেশ মিলিয়নে ১০ হাজারের বেশি টেস্ট সম্পন্ন করেছে। তাদের মধ্যে রয়েছে আইসল্যান্ড, আরব আমিরাত, সুইজারল্যান্ড। জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, সিংগাপুর, কোরিয়াও টেস্ট কর্মযজ্ঞে অনেক এগিয়ে গিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া টেস্টসহ বাকি পুরো প্যাকেজ বাস্তবায়ন করে ইপি কার্ভকে চ্যাপ্টা করতে অনেকটা এগিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যসেবা এখনো অনেক পিছিয়ে। সেবা খাত কোভিড-১৯ প্রতিরাধে কতটুকু এগিয়ে যেতে পারবে তার পুরোটাই নির্ভর করছে সঠিক পরিকল্পনা আর নীতিনির্ধারণের ওপরে। দেরিতে হলেও কোভিড-১৯ প্রতিরোধে টেস্টকে বিবেচনায় এনেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এজন্য দেশের বিভাগগুলোসহ বেশ কিছু কোভিড-১৯ টেস্টের ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হয়েছে; কিন্তু কোনো লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ না করে শুধু যাদের মধ্যে সম্ভাব্য উপসর্গ রয়েছে তাদের নমুনাই টেস্ট করা হচ্ছে। কোভিড-১৯ সংক্রমণের সম্ভাব্য স্বাস্থ্য বিপর্যয়কে রুখতে হলে অন্য সব বিষয় নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সঙ্গে টেস্টের সংখ্যা বাড়ানো খুবই প্রয়োজন। আরটি পিসিআর ব্যবহার করে নমুনা থেকে কোভিড-১৯-এর উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়। এটি একটি মলিকুলার টেস্ট পদ্ধতি। তাই এর জন্য প্রয়োজন আরটি পিসিআর মেশিন, টেস্ট কিট ও মলিকুলার বায়োলজিতে দক্ষ মলিকুলার বায়োলজিস্ট ও টেকনিশিয়ান। ব্যয়বহুল এই যন্ত্রটি বিশেষায়িত ক্লিনিক্যাল টেস্টের জন্য সাধারণত ব্যবহূত হয়। তাই আমরা চাইলেও স্বাস্থ্য পরিদপ্তরের পক্ষে সহজে মেশিনসহ দক্ষ জনশক্তির ব্যবস্থা করা খুব সহজ কাজ নয়। তাই পরিকল্পনা করা দরকার যত অল্প সময়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা যায় তার দিকে। সঙ্গে সঙ্গে পর্যাপ্ত মেশিন ও কিটের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। আশার কথা হলো বাংলাদেশের অনেক গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কিউ পিসিআর বা আরটি পিসিআর মেশিন ও দক্ষ জনশক্তি রয়েছে। এই মেশিন ও দক্ষ জনশক্তিকে এই আপত্কালীন সময়ে কাজে লাগানো যেতে পারে। এর জন্য দরকার সমন্বিত প্রয়াস। শুনেছি মত্স্য ও পশুপালন মন্ত্রণালয় লাইভস্টক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের কোভিড-১৯ টেস্টের সক্ষমতার কথা জানিয়েছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ও এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে পারে যাতে করে এই মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সক্ষমতাকে কাজে লাগানো যায়। তাছাড়া ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজির মলিকুলার বায়োলজিস্টরাও এ কাজে এগিয়ে আসতে পারেন। আরটি পিসিআর সমন্বিত অনেক ল্যাবরেটরিকে অস্থায়ী ভিত্তিতে ক্লিনিকেল ল্যাবরেটরিতে রূপান্তর বা মেশিন ও দক্ষ মলিকুলার বায়োলজিস্টদের ক্লিনিক্যাল ল্যাবরেটরিতে স্থানান্তরিত করে কোভিড-১৯ টেস্টের কর্মযজ্ঞকে এগিয়ে নিয়ে যাবার সম্ভাব্যতা অতি দ্রুত যাচাই করা দরকার। সবার সমন্বিত প্রয়াসই আমাদের কোভিড-১৯-এর যুদ্ধে বিজয়ী করতে পারে।
n লেখক :কৃষিবিদ