করোনা ভাইরাসের ঝুঁকির মধ্যে কারখানা খুলে শ্রমিকদের কাজে আনা নিয়ে তীব্র সমালোচনার রেশ কাটতে না কাটতেই ফের রাস্তায় নেমেছেন শ্রমিকেরা। বেতনের দাবিতে গতকাল রাজধানীর মিরপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, টঙ্গী, উত্তরখান ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকেরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছেন। অনেক কারখানা গত মাসের বেতন দেয়নি। কোনো কোনো কারখানা এখনো ফেব্রুয়ারি মাসের বেতনও পরিশোধ করেনি। আর্থিক কষ্টে থাকা শ্রমিকেরা তাই নেমে এসেছেন রাস্তায়।
করোনা ভাইরাসের এ ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সরকার মানুষকে ঘর থেকে বের না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে। সামাজিক দূরত্বের কথাও বলা হচ্ছে। কিন্তু পেটের তাগিদে শ্রমিকেরা রাস্তায় নেমে আসায় ফের করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ল। এর মধ্যে কিছু এলাকায় সরকার ঘোষিত লকডাউনও চলছে। শ্রমিকেরা এ পরিস্থিতির জন্য দুষছেন মালিকপক্ষকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সব মিলিয়ে বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৩০টি কারখানার শ্রমিকেরা বেতনের দাবিতে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছেন। শ্রমিক নেতারা জানিয়েছেন, বিদ্যমান পরিস্থিতির মধ্যেও কোনো কোনো কারখানা শ্রমিক ছাঁটাই করছে। আবার কোনো কোনো কারখানা মালিক এরই মধ্যে লে-অফের (সাময়িক বন্ধ) নোটিশও টানিয়ে দিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিল্পাঞ্চল অধ্যুষিত এলাকাসহ দেশব্যাপী শ্রম পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কমিটি গঠন করেছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
শ্রমিক নেত্রী ও গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, চার দশকের গার্মেন্টস শিল্প তিন মাসের বেতন দেওয়ার সক্ষমতা না রাখা দুঃখজনক। তারা সরকারের ওপর নির্ভর করছে। এমনকি এক মাসের বেতনের দায়িত্বও (মার্চের) নিতে পারল না। শ্রমিকেরা রাস্তায় নেমে আসায় সংক্রমণ (করোনা ভাইরাসের) বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, মূলত সরকারের কাছ থেকে আরো বেশি পরিমাণে প্রণোদনা আদায়ে দর কষাকষির জন্যই শ্রমিকদের এভাবে বলি দেওয়া হচ্ছে।
তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি ড. রুবানা হক ইত্তেফাককে বলেন, ১৭টি কারখানায় (বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত) শ্রমিকেরা বেতনের দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন। আমরা কারখানা মালিকদের বলেছি, শ্রমিকদের বেতনের দিনক্ষণ ঠিক করে টাকা পরিশোধের জন্য। তারা সেটা করেছে। কারখানা মালিকদের একটি অংশ বলছেন, সরকারি ছুটি এবং কিছু এলাকা লকডাউনের কারণে বেতন দিতে সমস্যা হচ্ছে।
অবশ্য সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ইত্তেফাককে বলেন, এই বেতন তো মার্চের। তা তো ১০ তারিখের মধ্যেই দেওয়ার কথা। চাইলে তো মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল পদ্ধতি বা যে কোনো উপায়েই দেওয়া যেত। এমনকি গত মাসে বন্ধের সময়ও কিছু কারখানা চাইলে বেতন দিয়ে দিতে পারত। শ্রমিকের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে তো তাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হয় না।
সাভার থেকে আমাদের স্টাফ রিপোর্টার জানান, সাভারে বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবিতে সড়কে ব্যারিকেড এবং আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেছে ১০টি তৈরি পোশাক কারখানার সহস্রাধিক শ্রমিক। গতকাল সাভারের তেঁতুলঝোড়া, কলমা, কবিরপুর, জামগড়া এলাকায় পৃথক এ শ্রমিক বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। এ সময় সড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটে। কবিরপুর এলাকায় অবস্থিত ত্বো-হা টেক্সটাইল, কলমা এলাকার সেঞ্চুরি গার্মেন্টসের শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করেন। সেঞ্চুরি গার্মেন্টসে চার মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে জানিয়ে শ্রমিকেরা বলেন, এমনিতেই আমরা ক্ষুধার জ্বালায় ঘরে বসে থেকে মরে যাচ্ছি। এখন না হয় রাস্তায় মরব। বেতনের জন্য প্রতিবাদ করলে মালিকের লোকজন নির্যাতন ও ছাঁটাইয়ের হুমকি দেয়। তাই বাধ্য হয়ে আমরা করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও জীবনের মায়া ত্যাগ করে রাস্তায় নেমেছি।
তেঁতুলঝোড়া এলাকায় অবস্থিত রাকেফ অ্যাপারেল্স, উলাইল এলাকার জয়েনটেক্স, ফুলবাড়িয়া এলাকার দ্যা ক্লোথ ফ্যাশন, আর এম সোয়েটার, আশুলিয়ার জামগাড়া এলাকার পাইওনিয়ারসহ বেশ কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেছে।
গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, সেখানে লকডাউনের মধ্যেই মহানগরীর সাইনবোর্ড ও ভোগড়া বাইপাস এলাকার ইস্ট ওয়েস্ট গ্রুপ ও নিউওয়ে ফ্যাশন্স কারখানার শ্রমিকরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে। নিউওয়ে ফ্যাশন লিমিটেডের নিটিং অপারেটর শাহিনা বেগম বলেন, দুই মাস ধরে বেতন ভাতা পাচ্ছি না। এখন আমাদের না খেয়ে মরার উপক্রম হয়েছে। সরকার যে ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছে তা কেবল স্থানীয় গাজীপুরের ভোটাররা পাচ্ছেন। অন্যরা কোনো ত্রাণ পাচ্ছে না। যানবাহন বন্ধ থাকায় সন্তানদের গ্রামের বাড়িতেও রেখে আসতে পারছি না।
টঙ্গী সংবাদদাতা জানান, কারখানা বন্ধ রাখার আহ্বানের সুযোগে বেতন ভাতা পরিশোধ না করে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের অভিযোগ উঠেছে টঙ্গির খাঁ-পাড়া এলাকার এসআরপি সোয়েটার কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। খবর পেয়ে শ্রমিকরা কারখানার মূল ফটকের সামনে এসে বিক্ষোভ করেন। রাজধানীর উত্তরখানে টেক্স টেইলর এক্সপোর্ট বিডি লিমিটেডে বকেয়া বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা।
এদিকে শিল্পাঞ্চল পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, নারায়ণগঞ্জে ফকির নিটওয়্যার, রাহি নিট কম্পোজিট, আরএজেড লিমিটেড, মুন লাক্স নিট গার্মেন্টস, আইয়ুবপুর টেক্সটাইল মিল্স, পারভেজ ফ্যাশন্স, পিএস স্পোর্টস কারখানায় শ্রমিক বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে। যদিও নারায়ণগঞ্জেও লকডাউন চলছে।
বিজিএমইএ সহসভাপতি এস এম মান্নান কচি ইত্তেফাককে বলেন, সব মিলিয়ে ২৫ থেকে ৩০টি কারখানায় সমস্যা হয়েছে। তবে আগামী ১৬ তারিখের মধ্যে শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার বিষয়টি ফয়সালা হয়েছে। এখন বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী একটা বিশেষ পরিস্থিতি চলছে। এ অবস্থায় সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে শিল্পাঞ্চল পুলিশের আওতাধীন এলাকায় ৭ হাজার ৬০২টি কারখানা রয়েছে। এ তালিকায় বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, টেক্সটাইল মিল্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) ছাড়াও অন্যান্য শিল্প কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে গতকাল পর্যন্ত মার্চের বেতন পরিশোধ করেছে ১ হাজার ৯৫৬টি কারখানা। বিজিএমইএর হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত তাদের সদস্যভুক্ত ৭৬১টি কারখানা বেতন পরিশোধ করেছে। যদিও শিল্পাঞ্চল পুলিশের হিসেবে, বিকেএমইএসহ বেতন পরিশোধ করা কারখানার সংখ্যা ৫৩৯। এর বাইরে বিটিএমএর ৩৮৯টি কারখানার মধ্যে পরিশোধ হয়েছে ৬৭টি কারখানার বেতন।