করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিত্সাসেবায় চরম অব্যবস্থাপনা বিরাজ করছে। গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্তের পর রাজধানীর কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে এ সংক্রান্ত চিকিত্সাসেবা দেওয়া হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ এ হাসপাতালে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের চিকিত্সাসেবায় বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার সারারাত এই হাসপাতালে পানি ছিল না। কর্তব্যরত ডাক্তার, নার্স ও ভর্তি রোগীদের থাকা-খাওয়ারও সমস্যার অন্ত নেই। রোগীরা সেবা পাচ্ছেন না। চিকিত্সক-নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের নেই পর্যাপ্ত পিপিই, সু-কভার। দ্রুত প্রতিকারের পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়ে কর্তব্যরত ডাক্তার-নার্সরা বলেন, আমরা সেবা দিতে প্রস্তুত। কিন্তু অব্যবস্থাপনার মধ্যে সেবা দেব কিভাবে? হাত-পা বেঁধে দিয়ে সাঁতার কাটতে দেওয়ার মতো অবস্থা আমাদের। সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হলে ডাক্তার-নার্সরা সেবা দিতে কার্পণ্য করবেন না বলেও জানান তারা। দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। রাজধানী ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ সবচেয়ে বিপর্যস্ত। শুধু তাই নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশে মৃত্যু হারও অনেক বেশি। এই অবস্থায় প্রশ্ন ওঠেছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে। যাদের পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে, তার মধ্যে ১০ ভাগ রোগী করোনায় আক্রান্ত। বর্তমানে পরীক্ষা করা হয়েছে প্রায় ৭ হাজার মানুষের। এর মধ্যে ৬২১ জন আক্রান্ত হয়েছেন। সেই হিসেবে ৫ লাখ মানুষের পরীক্ষা করা হলে ৫০ হাজার আক্রান্ত রোগী পাওয়া যাবে। তখন আইসিইউ সাপোর্টের কী হবে? সারাদেশে সরকারি হাসপাতালে ৫০০ আইসিইউ বেড রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে সত্যিকারের আইসিইউ বেড আছে খুবই অল্পসংখ্যক। প্রত্যেকটি হাসপাতালে ১০ ভাগ আইসিইউ বেড স্থাপন করতে হবে। অর্থাত্ ২০০ বেডের হাসপাতাল হলে ২০টি আইসিইউ বেড থাকতে হবে। এমনিতেই দেশে ডাক্তার-নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবা কর্মীর সংকট প্রকট। ঘটনা-দুর্ঘটনাসহ হার্ট, কিডনি, অপারেশনের রোগীসহ দৈনিক প্রায় দেড় লাখ ইমার্জেন্সি রোগীর সেবা দিতে ডাক্তার-নার্সরা হিমশিম খাচ্ছে। সেখানে নতুন করে যুক্ত হয়েছে করোনা রোগী। আর ১০০ জন অন্যান্য রোগীর জন্য যে ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন, মাত্র পাঁচ জন করোনা রোগীর একই ব্যবস্থাপনার মধ্যে চিকিত্সাসেবা দেওয়া দুঃসাধ্য বলে চিকিত্সকরা জানান। এমন অবস্থার মধ্যে বেকার ডাক্তার-নার্সরা করোনা রোগীদের চিকিত্সাসেবার যুদ্ধে অংশগ্রহণে আগ্রহী। তাদের দ্রুত নিয়োগ দেওয়ার পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত ডাক্তার-নার্সদেরও সংকটময় এই মুহূর্তে কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, বেকার ডাক্তার-নার্সদের নিয়োগের ব্যাপারে কথাবার্তা চলছে। একই সঙ্গে চিকিত্সাসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে সব ধরনের অব্যবস্থাপনা নিরসন করা হবে। অপরদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে আইইডিসিআরেরও সমন্বয়ের অভাব দেখা যাচ্ছে। আইইডিসিআরের একজন কর্মকর্তা করোনা রোগীদের সংক্রমণের পরিসংখ্যান অধিদপ্তরকে জানাতে চান না। এ নিয়ে তাদের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। একজন কর্মকর্তা এর সত্যতা স্বীকার করেছেন। বিষয়টি নিরসনের জন্য শীর্ষ কর্মকর্তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
সারা বিশ্ব এখন বুঝতে সক্ষম হয়েছে যে, স্বাস্থ্য খাতে বাজেট সবচেয়ে বেশি দেওয়া দরকার। নিউ ইয়র্কে একজন বৃদ্ধ আইসিইউয়ের অভাবে মারা গেছেন। তার আইসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজন ছিল। ঐ বৃদ্ধের ছেলে বাংলাদেশ পাসপোর্টধারী গৌতম বলেন, ‘চিকিত্সকরা আমাকে বলেছেন, বৃদ্ধের জন্য আইসিইউয়ের প্রয়োজন নেই। তাকে দিয়ে লাভ নেই। ’
কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালের কয়েক জন ডাক্তার-নার্স বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কথার সঙ্গে মাঠ চিত্রের কোনো মিল নেই। তারা যদি একবার কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে এসে সরেজমিন পরিদর্শন করত, তাহলে বুঝতে পারবেন কি অবস্থায় ডাক্তার-নার্সরা রোগীদের সেবা দিচ্ছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী ডাক্তার-নার্সরা টানা সাত দিন করোনা রোগীদের সেবার ডিউটি করে ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন। কিন্তু কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালের ডাক্তার-নার্সরা টানা ১১ দিন ডিউটি করছেন। এতে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। এটা দেখার যেন কেউ নেই। এমন অবস্থার মধ্যে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে অনেক রোগী সঠিক সেবা পাচ্ছেন না। কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট ডা. সিহাব উদ্দিন বলেন, কিছুটা সংকট আছে। তবে পানি সমস্যার কথা অস্বীকার করেন তিনি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই হাসপাতালে শিফট অনুযায়ী একজন ক্লিনার কাজ করছে। কয়দিন আগে এই হাসপাতাল থেকে একজন নারী বাবুর্চি পালিয়েছে, ফলে ডাক্তারদের খাবারের কষ্ট হচ্ছে বলে জানা গেছে। শুধু এই হাসপাতালেই নয়, করোনা আক্রান্ত চিকিত্সায় বাকি হাসপাতালগুলোতেও নেই পর্যাপ্ত লোকবল। ডাক্তার-নার্সদের পিপিই ও সু-কভারের অভাব রয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ডাক্তার-নার্সদের বলেছে, পিপিই ও সু-কভার ওয়াশ করে ব্যবহার করতে। ঝুঁকিপূর্ণ ডিউটি শেষে বাসায় গিয়ে বিশ্রাম করবেন নাকি পিপিই-সু-কভার ওয়াশ করবেন? এর মধ্যে আবার থাকা-খাওয়া নিয়ে সমস্যা।
শিল্পপতি তসলিম উদ্দিন কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে অনেকটা বিনা চিকিত্সায় মারা গেছেন। ৭ এপ্রিল আজগর আলী হাসপাতাল থেকে জানানো হয় কোভিড-১৯ পজিটিভ এসেছে। ঐদিনই কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে ভর্তি হন তসলিম উদ্দিন। বেডে নেওয়া হলেও রাত ১০টা পর্যন্ত কোনো ডাক্তার তাকে দেখতে আসেননি। তার ডায়াবেটিস, প্রেশারসহ কিছু শারীরিক সমস্যা আগে থেকেই ছিল। ৮ এপ্রিল সকাল ৯টায় যখন ছোটো ভাইয়ের সঙ্গে তসলিম উদ্দিনের কথা হয়, তখন তসলিম জানান যে কোনো ডাক্তার দেখতে আসেননি। কোনো ওষুধও দেননি। এ ব্যাপারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হয় ৯ এপ্রিল সকাল ১০টায়। জানানো হয়, ডাক্তারের রাউন্ড চলছে, হয়তো তাই ফোন ধরছে না। এক ঘণ্টা পর যোগাযোগ করুন। পরে ১২টা বা সাড়ে ১২টায় জানানো হয় ওনাকে অচেতন অবস্থায় ফ্লোরে পাওয়া গেছে এবং ওনার চিকিত্সা চলছে। বিকাল ৩টায় ওনারা জানতে পারেন যে তসলিম উদ্দিনকে ফ্লোরে নয়, পাওয়া গেছে একটা বাথরুমে দরজা বন্ধ অবস্থায় এবং দরজা কেটে ওনাকে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
রাজধানীর উত্তরায় করোনা রোগীদের জন্য চিকিত্সাসেবা প্রদানকারী রিজেন্ট হাসপাতালের চিত্রও অভিন্ন। সেখানেও পানি সংকট, খাবার ব্যবস্থাপনায় চরম অব্যবস্থাপনা। এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর রাজধানীর আটটি হাসপাতালকে নির্ধারণ করেছে করোনা আক্রান্তদের চিকিত্সার জন্য। হাসপাতালগুলো হচ্ছে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল, শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, রেলওয়ে হাসপাতাল, মহানগর জেনারেল হাসপাতাল, মিরপুর লালকুঠি হাসপাতাল, রিজেন্ট হাসপাতাল উত্তরা ও মিরপুর এবং যাত্রাবাড়ীর সাজিদা ফাউন্ডেশন। এই হাসপাতালগুলো নির্ধারণ করা হলেও রাজধানীর দুটি মাত্র হাসপাতালে করোনা আক্রান্তদের চিকিত্সা হচ্ছে বলে জানা গেছে। বাকিগুলো বহির্বিভাগে করোনা উপসর্গ সর্দি, জ্বর, কাশি নিয়ে আসা রোগীদের চিকিত্সা দিচ্ছে। তাদের এখনো রোগী ভর্তি করানোর মতো প্রস্তুতি নেই। শুধু তাই নয় যে দুটি হাসপাতালে চিকিত্সা প্রদান করা হচ্ছে সেগুলোতেও নেই পর্যাপ্ত জনবল, নার্স ও ইকুয়েপম্যান্ট।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. আমিরুল হাসান বলেন, কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে নিজস্ব কিছু সমস্যা হচ্ছে। তবে এটা থাকবে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে যেসব সমস্যা রয়েছে তা দ্রুত নিরসন হয়ে যাবে।