বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচে নেমে আসবে :বিশ্বব্যাংক

ছয় মাস আগেও বাংলাদেশে ৭ দশমিক ২ শতাংশ উচ্চ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিলেও বিশ্বব্যাংক বলছে করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯) প্রভাবে চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছর মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ২ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে। শুধু চলতি অর্থবছরই নয়, আগামী (২০২০-২১) অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধি আরো কমে ১ দশমিক ২ থেকে ২ দশমিক ৯ শতাংশের মধ্যে নেমে আসতে পারে। বসন্তকালীন সভা উপলক্ষ্যে গতকাল রবিবার ‘সাউথ এশিয়া ইকোনমিক ফোকাস’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশ নিয়ে এই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এবারের প্রতিবেদনে করোনা ভাইরাসের অর্থনৈতিক প্রভাব বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। এবছর বাজেটে ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি পালটে গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা গত ৪০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ হয়েছে।

করোনার (কোভিড-১৯) প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যাপকভাবে পড়বে। উত্পাদন খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাকের চাহিদা বিশ্বব্যাপী কমে যাবে। ফলে এবছর বাংলাদেশের রপ্তানি ২০ শতাংশের বেশি কমে যাবে। আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে আসায় তৈরি পোশাক শিল্পে ধাক্কা আসবে। বেকারত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে দরিদ্র বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহুরে দরিদ্র মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গ্রামীণ অঞ্চলে অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যাও বাড়বে। জাতীয়ভাবে সবকিছু বন্ধ ঘোষণা করায় পুরো দেশ কার্যত থমকে রয়েছে। ফলে বেসরকারি ভোগব্যয় কমে যাচ্ছে।

প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষ্যে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্সি টিমবন বলেন, করোনা মহামারি কতটা দীর্ঘায়িত হবে, তার ওপর নির্ভর করছে অর্থনীতিতে এর প্রভাব কতটা হবে। বাংলাদেশ সরকার দ্রুত স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যবস্থা নিয়েছে। প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করাসহ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়িয়েছে। সরকারকে করোনা প্রতিরোধের কাজে সহায়তা করার জন্য তাত্ক্ষণিক ১০ কোটি ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তিনি আরো উল্লেখ করেন, কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশকে সহায়তা দিতে বিশ্বব্যাংক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনার প্রভাবে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নিম্ন আয়ের মানুষ। বিশেষ করে সেবা খাতে যারা নিয়োজিত রয়েছেন, খুচরা ব্যবসায়ী এবং পরিবহন খাতের শ্রমিক যারা স্বাস্থ্যসেবা অথবা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বাইরে রয়েছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, কোভিড-১৯ দক্ষিণ এশিয়ার বৈষম্য বাড়িয়ে দিবে। দক্ষিণ এশিয়ার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বিশ্বব্যাংক বলেছে, এ অঞ্চলে কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ায় হঠাত্ করেই নিম্ন আয়ের মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ছে। ফলে বহু শ্রমিক শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছে। ফলে দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠে আসা বহু মানুষ আবার দরিদ্র হয়ে পড়বে। এখনই খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা নেই। তবে করোনা সংকট যদি দীর্ঘায়িত হয় সেক্ষেত্রে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে যারা দারিদ্র্যের খুব ঝুঁকিতে রয়েছে তারা হুমকিতে পড়বে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বল্প মেয়াদে স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়া, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় খাদ্য সহায়তা বাড়ানো, হাসপাতালগুলোরে প্রয়োজনীয় সরবরাহ বৃদ্ধি করার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সেইসঙ্গে বেকার শ্রমশক্তির জন্য স্বল্প মেয়াদে কর্মসৃজনী কর্মসূচি গ্রহণ, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ বাড়ানোসহ প্রণোদনার উদ্যোগ নিতে হবে। বাণিজ্য ঠিক রাখতে আমদানি-রপ্তানি শুল্ক কাঠামো সহজ করতে হবে। লকডাউন শিথিল হবার পর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে সমন্বিত প্রক্রিয়ায় আর্থিক প্রণোদানা ও অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি করার সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর আর্থিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই স্বল্প মেয়াদে খরচের পরিকল্পনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যয় পরিকল্পনা করার প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তান, মালদ্বীপ, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কার ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরে দক্ষিণ এশিয়ার গড় প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে, যা চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।

এবছর দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে আফগানিস্তান মাইনাস ৫ দশমিক ৯ থেকে মাইনাস ৩ দশমিক ৮ শতাংশ, মালদ্বীপ মাইনাস ১৩ শতাংশ থেকে মাইনাস সাড়ে ৮ শতাংশ, পাকিস্তান মাইনাস ২ দশমিক ২ শতাংশ থেকে মাইনাস ১ দশমিক ৩ শতাংশ ও শ্রীলঙ্কা মাইনাস ৩ শতাংশ থেকে মাইনাস দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে। এ ছাড়া চলতি অর্থবছরে ভারতের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ হতে পারে। নেপালে ১ দশমিক ৫ থেকে ২ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ভুটানে ২ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে।