প্রণোদনা :কাহাকেও বাদ দিয়া নহে

মধ্য আয়ের নিম্ন সারিতে যখন বাংলাদেশ পা রাখিল, যারপরনাই বিস্ময় সারা বিশ্বে, তৃতীয় বিশ্বের এই দেশটি কেমন করিয়া এতদূর আগাইল। ৮ শতাংশ ছাড়াইয়া দুই অঙ্কের ঘরে যখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা, ঠিক তখনই বিশ্ব জুড়িয়া মহামন্দার ডঙ্কা বাজিয়া উঠিল। করোনা নামের এক অসুর বিশ্বকে টালমাটাল করিয়া দিল। এমন অকল্পনীয় পরিস্থিতিতে গোটা বিশ্ব যখন করণীয় ঠিক করিতে হিমশিম খাইতেছে, সংগত কারণেই তখন বাংলাদেশের অর্থনীতিও থমকাইয়া দাঁড়াইয়াছে। হঠাত্ গতিপথ স্তব্ধ করিবার মতন, করোনা আসিয়া দাঁড়াইয়াছে দুয়ারে। লন্ডভন্ড করিয়া দিয়াছে আর্থিক পরিকল্পনা। এমন অবস্থায় ধনীদের অনুসরণ করিয়া আমাদের দেশেও প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হইয়াছে। দফায় দফায় এই প্যাকেজ ঘোষণা করিলেও অর্থনীতিবিদগণ বলিয়াছেন, ইহা যথেষ্ট নহে। সরকারের এখনো আরো অনেক কিছুই করিবার রহিয়াছে। আমরা অতটা রসহীন ভাষায় বলিব না। তবে ইহা স্বীকার করিতে হইবে যে, প্রণোদনা প্যাকেজ সমৃদ্ধ আগামীর অগ্রযাত্রা ধরিয়া রাখিতে যথেষ্ট নহে। এখনো অনেক খাত বাকি রহিয়া গিয়াছে যাহারা প্রণোদনার আওতায় পড়ে নাই। কেহ কেহ ঘোষিত প্যাকেজগুলির সদ্ব্যবহার লইয়াও প্রশ্ন তুলিয়াছেন। আমরা বলিব, সরকার যাহা করিয়াছে তাহার জন্য সাধুবাদ। কিন্তু বাকিদের দায়িত্বও সরকারকে নিতে হইবে।

যাহারা বাদ পড়িয়াছেন তাহাদের কথা পরে, কিন্তু ঘোষিত প্যাকেজও কি পর্যাপ্ত? ব্যবসায়—শিল্প-উদ্যোগে মাত্র তিন মাসের প্রণোদনা, কিংবা এক বছরের জন্য স্বল্প সুদে চলতি মূলধন ঋণসুবিধা কি যথেষ্ট? বিশ্ব সংস্থাগুলি ইতিমধ্যেই বলিয়াছে, করোনার এই অভিঘাত পরবর্তী কয়েক বছর ধরিয়া চলিবে। ইহার প্রভাবমুক্ত হইতে সময় লাগিবে কমপক্ষে ২০২৩ সাল পর্যন্ত। তাহা হইলে স্বল্প পরিসরের এই প্রণোদনা কীভাবে অর্থনীতির চলকগুলিকে বেগবান করিবে? যদি তাহা নাই-বা করে, তাহার প্রভাবে বেকারত্ব বাড়িবে। মানুষ আয়হীন হইয়া পড়িলে দারিদ্র্যসীমার নিচে নামিয়া যাইবে। নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণি, বিশেষত যাহারা বেসরকারি খাতের উপর নির্ভর করিয়া দিনাতিপাত করে; তাহাদের ভবিতব্য কী আমরা ভাবিব না? এমনকি সংবাদপত্রে কর্মরত পেশাজীবীদেরও বর্তমান পরিস্থিতি কি আমরা অনুধাবন করিতে পারিয়াছি? অনুরূপভাবে বলিতে হয়, যাহারা স্বকর্মসংস্থানে নিয়োজিত তাহাদের কী হইবে? অর্থনীতির ভাষায় যাহাকে অসংগঠিত খাত হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। এই তালিকায় রহিয়াছেন রিকশা, ভ্যানচালক, খেতমজুর, গৃহপরিচারক-গৃহপরিচারিকা, ফেরিওয়ালা, কুলি, ইটভাটার শ্রমিক তথা যাহাদের নির্দিষ্ট করিয়া আয়-রোজগার নাই। বর্তমান ‘লকডাইনে’ তাহাদের আয় বন্ধ হইয়া যাওয়ায় পেটে ইটপাথর বাঁধিবার উপক্রম হইয়াছে। বৃহত্ এই জনগোষ্ঠীর সিংহভাগের কাছেই ত্রাণের সামগ্রী পৌঁছায় না। ইহাদের অনেকে ত্রাণের লাইনে দাঁড়াইতেও সংকোচ বোধ করেন।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের মূল প্রতিপাদ্য হইল—‘কাহাকেও বাদ দিয়া নহে’; সকলকে লইয়াই আগাইতে হইবে। কোনো শ্রেণি-গোষ্ঠীকে বাদ দিয়া আমরা টেকসই উন্নয়ন করিতে পারিব না। প্রণোদনায় ‘মিসিং গোষ্ঠী’কে অন্তর্ভুক্ত করিতে হইবে। না হইলে দারিদ্র্যের হার যেমন বাড়িবে, তেমনি দরিদ্র জনগোষ্ঠী স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পিছাইয়া পড়িবে। যাহা উত্পাদনশীলতায়ও বিরূপ প্রভাব ফেলিবে। বোধ করি, সেই জন্যই নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিত্ ব্যানার্জি বলিয়াছেন, প্রয়োজনে টাকা ছাপাইয়া মানুষের মধ্যে বিলি করিতে হইবে। নচেত্ ঘোর বিপদের আশঙ্কাও করিয়াছেন তিনি। আমরা আশা করি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ হইতেই বিষয়টি দেখিবেন। তাহার অর্থমন্ত্রী মহোদয়ও  প্রাজ্ঞজন। তাহার রহিয়াছে স্বপ্ন দেখা এবং স্বপ্ন দেখাইবার এক ‘ম্যাজিক’ ক্ষমতা। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে তিনি যেইভাবে ঢালিয়া সাজাইয়াছেন, অর্থ মন্ত্রণালয়েও তাহার দায়িত্ব তিনি নতুন স্বপ্ন, নতুন আশা-উদ্দীপনা লইয়া অগ্রসর হইবেন; তাহাতে আমাদের কোনো সংশয় নাই। আমরা আশাবাদী এবং প্রত্যাশা রাখি—দেশের সব শ্রেণি পেশার মানুষেরা উপযুক্ত প্রণোদনা পাইবেন, কাহারোই যেন খাবার অভাবে পড়িতে না হয়।