কতটা অমানবিক হতে পারি আমরা! কতটুকু নিষ্ঠুর হতে পারি—সেটা দেখিয়ে দিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের কিছু মানুষ। দুই পক্ষের সংঘর্ষে এক জনের পা কেটে, সেই কাটা পা নিয়েই তাদের সে কী উল্লাস। ন্যূনতম মানবিকতা থাকলে সেটা কি সম্ভব? করোনা সন্দেহে এক বৃদ্ধকে নেত্রকোনায় মোহনগঞ্জে হাসপাতালের পাশে মাঠের মধ্যে ফেলে যায় তার ভাগেন। সেখানেই মৃত্যু হয় ঐ বৃদ্ধের। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া এক বৃদ্ধের মরদেহ মাটিতে রেখেই জানাজা পড়া হয়েছে। গ্রামবাসী খাটিয়া দিতে রাজি হয়নি। এমন অনেক অমানবিকতা, নিষ্ঠুরতার খবর আমরা পাচ্ছি। এর উলটো চিত্রও বহু। বিপদে এগিয়ে আসা, মানুষকে খাদ্য দেওয়াসহ অনেক মানবিক চিত্রও আছে।
সর্বশেষ রবিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে কৃষ্ণনগর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান জিল্লুর রহমান ও থানাকান্দি গ্রামের ‘সর্দার’ আবু কাউসার মোল্লার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এতে কাউসার মোল্লার পক্ষের লোকজন চেয়ারম্যানের পক্ষের মোবারক মিয়া (৪৫) নামে এক জনের একটি পা কুপিয়ে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। পরে পায়ের বিচ্ছিন্ন অংশ নিয়ে গ্রামে উল্লাস করা হয়। এ দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সারাদেশের মানুষ তাদের এ নিষ্ঠুরতা দেখে ধিক্কার দিয়েছে। যদিও পুলিশ কাউসার ও জিল্লুরকে গ্রেফতার করেছে। করোনার মধ্যে এ কার্যকলাপে হতবাক হয়ে গেছেন দেশের মানুষ।
সুনামগঞ্জের দোয়ারা বাজারে জ্বর-সর্দি, শ্বাসকষ্ট নিয়ে মারা যাওয়া যুবকের লাশ দাফনে মসজিদের খাটিয়া দেওয়া হয়নি। গত বৃহস্পতিবার খাটিয়া ছাড়া দুই ভাই ও বাবার কাঁধে করে লাশ দাফন করতে নিয়ে যাওয়ার একটি ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয়। বুধবার ঐ যুবকের দাফন করা হয়। মৃতের স্বজনরা জানিয়েছেন, গত মঙ্গলবার রাতে ইটভাটার ঐ শ্রমিক মারা যান। করোনা ভাইরাসের উপসর্গ ছিল তার মধ্যে। শুধু এ কারণে গ্রামবাসী খাটিয়া দেয়নি, আসেনি জানাজায়। এমনকি লাশ দাফনেও কোনো সহযোগিতা করেনি।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার খাঞ্জাপুর গ্রামের এক বৃদ্ধকে গত শনিবার শ্বাসকষ্ট, জ্বর, ঠান্ডা ও কাশি নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিত্সক মৃত ঘোষণা করেন। ঐ বৃদ্ধের লাশ গ্রামে নেওয়া হলে গ্রামবাসী খাটিয়া দিতে রাজি হয়নি। বাধ্য হয়ে স্বজনরা মাটিতেই লাশ রেখে জানাজা করেন। এমনকি জানাজা বা দাফনেও এগিয়ে আসেনি গ্রামের মানুষ। তারা দূর থেকে শুধু দেখেছেন। এখন ঐ পরিবারটি একঘরে।
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে দুই দিন আগে ভাগেনর বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলেন এক বৃদ্ধ। সেখানেই জ্বর, সর্দি কাশি ও শ্বাসকষ্ট শুরু হলে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানকার চিকিত্সকরা নমুনা রেখে বৃদ্ধকে বাড়ি নিয়ে যেতে বলেন। কিন্তু করোনা সন্দেহে ভাগেনর স্ত্রী মিতু রাণী সরকারসহ সঙ্গে থাকা অন্য দুই জন হাসপাতালের পাশে মাঠের মধ্যে বৃদ্ধকে ফেলে চলে যান। বিকালেই মাঠের মধ্যে মারা যান বৃদ্ধ। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ঐ বৃদ্ধের ছবি ছড়িয়ে পড়ে। দেশের মানুষ ধিক্কার জানিয়েছেন ভাগেনকে।
এমন অসংখ্য ঘটনায় মানুষের নিষ্ঠুরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কেন মানুষ এত নিষ্ঠুর হচ্ছেন? মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সামাজিক অস্থিরতা আর সহিংসতা থাকলে মানুষ নিষ্ঠুর হয়। অযোগ্য ব্যক্তি যদি আধিপত্য পেয়ে যায় তখন সে নৃশংসতাকে তার আধিপত্য ধরে রাখতে ব্যবহার করে। দীর্ঘদিনের হতাশা, অপ্রাপ্তিবোধ আর বঞ্চনার শিকার হলেও মানুষ অমানবিক হয়ে যায়। ব্যক্তিত্বের বিকার বা মাদকের প্রভাবে এমন হয়।
করোনার এই পরিস্থিতির মধ্যে মানুষের মানবিকতার উদাহরণও বহু। সাধারণ মানুষ এগিয়ে এসেছেন অসহায় মানুষের পাশে। কয়েকদিন আগে এক বৃদ্ধ কিশোরগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডের পেছনে পড়েছিলেন। সবাই করোনা রোগী ভেবে ঐ বৃদ্ধের কাছে যায়নি। পরে এগিয়ে আসেন পুলিশ সদস্যরা। ঐ বৃদ্ধের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন তিনি ক্ষুধার যন্ত্রণায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে খাবার বিতরণ করে।
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের এসিসট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার জসিম উদ্দিন খান ও প্রেস ইনস্টিটিউটের সহকারী প্রশিক্ষক বারেক কায়সায়সহ আরো কয়েক জন মিলে গড়ে তুলেছেন ‘সঙ্গে আছি’ নামে একটি সংগঠন। এই সংগঠনের উদ্যোগে গতকাল সোমবার পর্যন্ত ২ হাজার পরিবারের কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তারা মূলত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষকে চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস পৌঁছে দিচ্ছেন। বারেক কায়সায় ইত্তেফাককে বলছিলেন, ‘সবচেয়ে কষ্টে আছে মধ্যবিত্ত’। তারা হাত পাততে পারে না, আবার ঘরে খাবার নেই। ফলে তাদের কাছে যারা ফোন করছেন তাদের বাসায় গিয়ে এগুলো পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। তাদের সংগঠনকে যারা সহায়তা দিচ্ছেন বা যারা সহায়তা নিচ্ছেন তাদের কারো নাম তারা প্রকাশ করছেন না। তাদের এই কাজে যারা সহযোগিতা করছেন তাদের অধিকাংশই সাংবাদিক।
ঠাকুরগাঁওয়ে মানবিক দোকান খুলেছে ‘জুলুমবস্তি’ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। এ দোকান থেকে নামমাত্র মূল্যে নিম্ন আয়ের মানুষকে নিত্যপ্রয়োজনী বিক্রি করা হচ্ছে। সংকটময় মুহূর্তে কম দামে পণ্য পেয়ে দারুণ খুশি ক্রেতারা। দিনমজুর, শ্রমিক, রিকশা ও ভ্যানচালক মূলত তাদের দোকানের ক্রেতা। প্রতিদিন বিকাল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টা দোকান খোলা রাখছে তারা।