করোনা রোগীর চিকিত্সা ব্যবস্থাপনা

নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক আলবেয়ার কামু বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকে ‘দি প্লেগ’ উপন্যাসটি লিখিয়াছিলেন ফরাসি উপনিবেশ শুরুর পর বর্তমান আলজেরিয়ার ওরান অঞ্চলের  প্লেগ মহামারির প্রেক্ষাপটে। সেই মহামারিতে ৭৫ হইতে ২০০ মিলিয়ন মানুষ মৃত্যুবরণ করিয়াছিল। মহামারির সেই কালো মৃত্যুর সাক্ষী এই উপন্যাসটি। ইহাতে দেখা যায়, ডা. বার্নাড রিও শত শত প্লেগ আক্রান্ত মানুষকে সুস্থ করিয়া তুলিলেও তিনি তাহার প্রিয়তমা স্ত্রীকে রক্ষা করিতে পারেন নাই। কারণ যে কোনো মহামারিতে ডাক্তার-নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ফ্রন্টলাইন যোদ্ধার ভূমিকা পালন করিতে হয়। বর্তমানে শুধু উন্নত দেশেই নহে, বাংলাদেশেও আমাদের চিকিত্সক-নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা একই ভূমিকা পালন করিয়া যাইতেছেন; কিন্তু করোনা রোগের চিকিত্সায় অব্যবস্থাপনার কারণে তাহাদের জীবনে ঝুঁকি বাড়িতেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক তথ্যমতে, ইতোমধ্যে বিশ্বের ৫২টি দেশে ২২ হাজারেরও বেশি স্বাস্থ্যকর্মী করোনায় আক্রান্ত হইয়াছেন। বাংলাদেশেও একাধিক ডাক্তার-নার্স আক্রান্ত হইয়াছেন। এইদিক দিয়া আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীদের উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠা বৃদ্ধি পাওয়া অস্বাভাবিক নহে।

বাংলাদেশে বিদেশফেরত করোনা রোগীর আইসোলেশন ক্যাম্প ও চিকিত্সার জন্য প্রথম হইতেই বাছিয়া লওয়া হয় রাজধানীর উত্তরায় অবস্থিত প্রধান বিমানবন্দরের নিকটবর্তী বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালটি; কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই হাসপাতালে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিত্সাসেবা লইয়া বর্তমানে নানা বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ পাওয়া যাইতেছে। ইত্তেফাকের এক খবর অনুযায়ী গত শনিবার সারারাত্রি এই হাসপাতালে পানি ছিল না। ইহাতে কর্তব্যরত ডাক্তার, নার্স ও রোগীদের নানা দুর্ভোগ পোহাইতে হয়। তাহাদের থাকা-খাওয়ায় কষ্ট হয়। ইহাছাড়া চিকিত্সক-নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য এখানে পর্যাপ্ত পিপিই, সু-কভার ইত্যাদির অভাব রহিয়াছে বলিয়া জানা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী ডাক্তার-নার্সরা টানা সাত দিন করোনা রোগীদের সেবা দেওয়ার পর ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকিবেন; কিন্তু এই হাসপাতালে একটানা ১১ দিন ডিউটি করায় অনেকে অসুস্থ হইয়া পড়িতেছেন। করোনা রোগীর চিকিত্সা লইয়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইইডিসিআরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের কথাও জানা যায় যাহা মোটেও কাম্য নহে। এই সকল নানা অব্যবস্থাপনার দ্রুত অবসান হওয়া প্রয়োজন।

প্রকৃতপক্ষে সাধারণ ১০০ রোগীর চিকিত্সাসেবার জন্য যে ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন, তাহা মাত্র পাঁচ জন করোনা রোগীর জন্য প্রয়োজন একই ব্যবস্থাপনা। কেননা ইহা একটি সংক্রামক রোগ ও মহামারি। আর এইরূপ সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে ডাক্তারদের বলা হয় ‘সুপার স্প্রেডার’। কারণ ডাক্তারের সুরক্ষা না থাকিলে তাহার মাধ্যমে তাহার নিকটে আসা বাকি রোগীরাও সংক্রমিত হন। এইভাবে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়। ইতোমধ্যে করোনা আক্রান্ত রোগীকে সেবা দেওয়া একাধিক হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীদের আইসোলেশন বা হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হইয়াছে। এইভাবে সকল চিকিত্সক যদি আক্রান্ত হন বা আইসোলেশনে বা হোম কোয়ারেন্টাইনে চলিয়া যান, তাহা হইলে চিকিত্সাসেবা দেবেন কাহারা? তাহারা ঢাল-তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দারের মতো করোনার বিরুদ্ধে লড়াই চালাইয়া যাইতে পারেন না। সুতরাং কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালসহ যেই সকল হাসপাতালে নিরাপত্তা সরঞ্জাম, জনবলের ঘাটতিসহ বিভিন্ন সংকট রহিয়াছে তাহা দ্রুত নিরসনের পদক্ষেপ লইতে হইবে।