দেশ ও জনগণের মঙ্গলে জানতে হবে, মানতে হবে

অজয় দাশগুপ্ত

দুটো ভালো খবর দিয়ে শুরু করি। আমাদের প্রশান্ত পাড়ে করোনা সংক্রমণের হার কমে আসছে। সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং বা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভবপর হচ্ছে বলে  এই হার নিম্নমুখী।  এমন না যে একেবারে শেষ হয়ে গেছে কিন্তু কমে আসছে। তার পরও শান্তি বা স্বস্তিতে নেই সরকার। চিফ মেডিক্যাল অফিসার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ছাড় দেওয়ার কোনো চিন্তা নেই সরকারের। তারা আরো কিছুদিন কড়া নিরাপত্তা আর দূরত্ব বজায় রাখবেন।

আর একটি সুসংবাদ হলো ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের হাসপাতাল ত্যাগ। ভদ্রলোক গোড়ার দিকে নজর কাড়েননি। শুরুতে খুব একটা পছন্দের কেউ ছিলেন না। কিন্তু মহামারি করোনা ভাইরাসের পর তার ব্যাকুল ও উদ্বিগ্ন মুখ দেখে বুঝতে পারছিলাম তিনি আন্তরিক। সত্যি কথা বলতে কি বহু নেতার মুখ-চোখ-আচরণে এর ছিটেফোঁটাও নেই।  আপনি ট্রাম্পকে দেখলেই বুঝতে পারবেন, ভেতরে ভয় কিন্তু আচরণে উগ্র। এখনো  আবোলতাবোল বকে চলেছেন। পরোক্ষভাবে তার কথা হলো, মানুষ মরলে মরুক বিজনেস চালু রাখতে হবে।

পাশের দেশ ভারতের মোদির মুখে যতটা আকূলতা বা বেদনা তার চেয়ে বেশি বাতি জ্বালিয়ে ভুত তাড়ানোর তরিকা। পাকিস্তানের ইমরান খান এই সুযোগে রীতিমতো ভিক্ষায় নেমে গেছেন। লজ্জায় নিজের কথা মিন মিন করে বললেও উন্নয়নশীল দেশের নামে করোনা ভিখারি ইমরান চান সাহায্য। আদেশ নির্দেশ বা হুকুম দেওয়া এক কথা আর মমতা ব্যানার্জির মতো চোখে পানি নিয়ে হাতজোড় করা নেতা কম।

বরিসও  তাই করে চলেছিলেন। শরীর খারাপ নিয়েও ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা তার কথা জানা জরুরি। অলৌকিক শক্তি আছে কি নেই, সে দিকে না গিয়ে জীবন ফিরে পাওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন ডাক্তার নার্সসহ স্বাস্থ্য কর্মীদের। চমত্কার লেগেছে তার সত্য ভাষণ। তার মতে, নিউজিল্যান্ড পর্তুগাল এসব দেশের তিন জন নার্স দিনের পর দিন, রাতের পর রাত জেগে তাকে চোখে চোখে রাখায় তিনি বেঁচে গেছেন। এরা যদি সারাক্ষণ মনিটর না করতেন যে কোনো সময় নিভে যেতে পারত তার জীবন দ্বীপ। এবার বুঝুন, এই ম্যাসেজের গভীরতা কোথায়? আমার-আপনার মতো  আমজনতার জন্য কে দেবে এমন সময়? কোথায় পাবেন এই সেবা?

বাংলাদেশে এখন যে সমস্যা, তা হচ্ছে সামাজিক। সবাই বোঝে করোনার আতঙ্ক কতটা ভয়ংকর। উন্নত বিশ্ব নামে পরিচিত আমেরিকা ইংল্যান্ড ইউরোপ আজ অসহায়ত্বে ভুগছে। যারা দুনিয়াকে ভরসা জোগাতো, তাদের এই হাল দেখে অনেকে তৃপ্ত। আমাদের জনজীবনে গোঁজামিল আর অন্ধত্বের জয়জয়কার। একদল লোক মহা-আনন্দে বলে বেড়াচ্ছে চীন নাকি আমেরিকাকে পরাজিত করে ফেলেছে; আর চীনই এখন এক নম্বর দেশ। এরা ভুলে যায় কত লাখ মানুষ আমেরিকা আর ইউরোপে আছে আমাদের। কত বাঙালি অভিবাসন নিয়ে পড়াশোনা করতে বা ব্যবসা-বাণিজ্যে সেসব দেশে আছেন। আর চীনের সঙ্গে কতটা সম্পর্ক আমাদের। এটা আমরা জানি, চীন এখন আমাদের দেশে নানাভাবে সহায়তা করছে। কিন্তু সেটা একতরফা কিছু না। এতে উভয়ের লাভ জড়িত। আমরা চাই না তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নষ্ট হোক। তা ছাড়া পূর্ব ইউরোপসহ নানা দেশে চীনকে টার্গেট করে পোস্টার বিলবোর্ডের ছড়াছড়ি চলছে। চীনা প্রধানমন্ত্রীর ছবিসহ বলা হচ্ছে ধন্যবাদ আপনাকে আমাদের বিপদে ফেলার জন্য। সিডনি চীনা দূতাবাসের সামনে পাগলামি করা মানুষের ভিডিও দেখে বোঝা সহজ, মানুষ আস্তে আস্তে অধৈর্য আর তপ্ত হয়ে উঠছে। কিন্তু এটাও অন্যায্য। এমন কোনো প্রমাণ নেই যে চীন ইচ্ছে করে করোনা ছড়িয়েছে। আসলে উহান প্রদেশের গোপনীয়তা জন্ম দিচ্ছে এসব নানা অসন্তোষের। বাংলাদেশের সামনে যেখানে কঠিন সময় সেখানে অন্য সব ভাবনার চাইতে জরুরি সামাজিক নিরাপত্তা।

এ কথা বলি না সরকারের আন্তরিকতা নেই। শেখ হাসিনা একজন প্রাজ্ঞ দূরদর্শী নেতা। তার প্রতি মানুষের ভরসা অটুট। কিন্তু  মানতে হবে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ তেমন কোনো কাজ করছে না বা করে দেখাতে পারছে না যাতে মানুষ আশায় বাঁচতে পারে। বরং ইতিমধ্যে ত্রাণের চাল চুরির মতো ন্যক্কারজনক ঘটনায় জনগণ আতঙ্কিত। এসব মানুষের না আছে বিবেক, না কোনো মানবিক বোধ। এরা নৈতিকতা ধর্ম কিংবা ভালো কথা কিছুই শুনবে না। এদের ‘সাইজ’ করা না হলে এরা কখনোই কথা শোনার কেউ না। সমস্যা হচ্ছে আওয়ামী লীগের প্রবীণ সিনিয়র লিডারদের কেউ নেই শেখ হাসিনার পাশে। যারা নানাভাবে অভিজ্ঞ। এদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগালে মঙ্গল  হতো। এখন যে সব নবীনেরা আছেন তারা আন্তরিক হলেও তাদের সেই ইমেজ বা গ্রহণযোগ্যতা নেই। এমন সংকটকালে নেতারা ঘরবন্দি। সরকারি দলের সচিব নিজেই অসুস্থ। তার নিজের সেলফ কোয়ারেন্টাইনে থাকা জরুরি। অন্যদিকে বিএনপি এখনো একটি জনপ্রিয় দল। তাদের জনপ্রিয়তা দেখা না গেলেও অদৃশ্যে তা কাজ করে। সে দলের মুখপাত্র রিজভীর সাম্প্রতিক ছবি দেখে ভিরমি খেলাম। তাদের দপ্তরে জনমানব শূন্য টেবিলে তিনি পিপিই পরিধান করে মাইক্রোফোনে জাতিকে বুঝিয়ে চলেছেন সরকারি দলের কী কী ভুল। মাঠে ঘাটে নেই এমন একটা দলের কাছে জনগণ কী আশা করতে পারে?

সত্যি আমরা দুর্ভাগা জাতি। এত কোটি কোটি টাকার গল্প অথচ ইতিমধ্যে খাদ্যের ট্রাক আটক করে খাদ্য নিয়ে যাবার ঘটনা ঘটেছে। যার মানে মানুষ আর পারছে না। ঢাকার রাস্তায় খিদে পাগল মানুষের সারি। দেশের প্রায় সব জেলায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে করোনা। তার পরও নিরাপত্তা বিষয়টি জনমনে দাগ কাটছে না। অথবা তারা মানতে চাইছে না। এর পেছনে ধর্মের নামে যেসব উসকানি তা বন্ধ করা জরুরি। সামাজিক সংগঠন বা অন্য সবকিছু এখন ঘরবন্দি। কে নেবে তার দায়িত্ব? বিজ্ঞান ছাড়া কোনো গতি নেই। কিন্তু আজ কত বছর হলো আমরা কোনো বিজ্ঞানী পাইনি? কত বছর হলো দেশে একজন বিজ্ঞানী জন্মেছেন? সমাজ তো সেসব পথ আগেই রুদ্ধ করে রেখেছে। অথচ কয় দিন আগে ইতালির প্রধানমন্ত্রীর একটি এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউ দেখলাম বিবিসির সঙ্গে। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তার দেশ হয়তো অর্থনৈতিক মন্দা আর পতন ঠেকাবে পারবে কিন্তু দুনিয়া আগের মতো হবে না। সহজে যে হবে না সে কথাটা তিনি পরিষ্কার করে জানিয়ে দিয়েছেন। তার দেশে সবকিছু আস্তে আস্তে খুললেও রেস্তরাঁ হোটেল ক্যাফে ক্লাব খুলবে না সে ভাবে। যতদিন কোনো ভ্যাকসিনেশন টিকা ইত্যাদি বাজারে না আসছে, ততদিন এই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে মানুষকে। এভাবেই একদিন অভ্যাস বদলে যাবে  আমাদের।

বাংলাদেশ এই পৃথিবীরই একটি দেশ। বিশ্ব যখন আমাদের সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করেছে তখনই বড়ো  হয়ে উঠতে পেরেছি আমরা। এই যে বড়ো হয়ে ওঠা এ কারণেই দরকার সবার সাথে চলা। দুনিয়াকে দেখে না শিখলে ঠেকে শিখতে হবে আমাদের।  রাজনীতি আদর্শ বা শাস্ত্র সবকিছুর ওপরে এখন মানুষ। সে মানুষ বাঁচাতে আমাদের ঘরে থাকতে হবে। এই কঠিন সময়ে ঘরে থাকাই সবার জন্য মঙ্গল। দেশের সঙ্গে থাকুন, থাকুন বিশ্বের সঙ্গে।

n লেখক : সিডনি প্রবাসী