এমন বৈশাখ আর কখনোই আসেনি বাঙালির জীবনে। পহেলা বৈশাখের সকালে সুনসান নীরব রমনার বটমূল, শাহবাগের চারুকলা প্রাঙ্গণ। রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন শুরু হওয়ার পর থেকে মুক্তিযুদ্ধের সময় ছাড়া আর কখনোই বন্ধ ছিল না ছায়ানটের প্রভাতী আয়োজন।
স্বাধীনতার পর থেকে রমনার বটমূলে ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে গান গেয়ে, মঙ্গল শোভাযাত্রায় শামিল হয়ে বাঙালি বরণ করে নিত নতুন বছরের প্রথম সকালকে। এবার সেসবের কিছুই ছিল না। করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারণে দেশ জুড়ে লকডাউনে সাড়া দিয়ে প্রাণহীন এবারের বৈশাখ। শুধু রাজধানী ঢাকা নয়, সারাদেশেই বন্ধ ছিল এবারের বৈশাখবরণ।
গত সোমবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাঙালির সর্বজনীন উত্সব বাংলা নববর্ষ। প্রতিটি বাঙালি আনন্দ-উল্লাসের মধ্য দিয়ে উদ্যাপন করে থাকে এই উত্সব। এ বছর বিশ্বব্যাপী প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে পহেলা বৈশাখের বাইরের সব অনুষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এটা করা হয়েছে বৃহত্তর জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে। ঐ ভাষণেই করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বছর সবাইকে ঘরে বসে নববর্ষ পালনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়েই ছায়ানটসহ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ টেলিভিশনে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। বিশ্ব জুড়ে যে মহামারি চলছে, তাকে সামনে রেখে সংকট মোকাবিলায় প্রেরণাদায়ী সব গান পরিবেশন করেন শিল্পীরা।
‘উত্সব নয়, সময় এখন দুর্যোগ প্রতিরোধের’—এ প্রতিপাদ্যে সীমিত আকারে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ছায়ানট। ছায়ানটের সভাপতি সন্জীদা খাতুন প্রতি বছরের মতো বর্ষবরণ কথনে বলেন, বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন নিয়তই মানুষে-মানুষে, মানুষে-প্রকৃতিতে অভিনব এক সংযোগ সৃষ্টি করে। নতুন দিনের আশা নিয়ে নববর্ষ ফিরে ফিরে আসে বাঙালির জীবনে। কিন্তু আজ নতুন বছরের বার্তা যেন নতুন আশাকে ধূলিসাত্ করে দিতে চায়। জাতির জীবনে আজ ঘোর দুর্দিন, বিশ্বসমাজ আজ বিধ্বংসী মহামারিতে আক্রান্ত। উত্সবের দিন নয় আজ। বিপন্ন মানুষকে উদ্ধার করার দিন। নিজে নিরাপদ থাকার পাশাপাশি সবইকে নিরাপদ রাখার সময়।
মঙ্গলবার্তা নিয়ে আসা মঙ্গল শোভাযাত্রাও বাতিল করা হয় জাতির মঙ্গলের কথা চিন্তা করেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার আহমেদ বলেন, ‘শোভাযাত্রা বের করা নয়, এখন আমরা যে যুদ্ধে নেমেছি, এই যুদ্ধের কৌশলটি হচ্ছে আমাদের ঘরে অবস্থান করা। এই যুদ্ধে জয়ী হওয়ার এটাই একমাত্র কৌশল। আমরা কিন্তু ভয়ে ঘরে অবস্থান করছি না। এই যুদ্ধে জয়ী হতে গেলে আমাদের এটাই মানতে হবে।’