দুই-তৃতীয়াংশ জেলায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত দেড় হাজারের বেশি রোগী পাওয়ার পর গোটা দেশকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, ‘যেহেতু বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় এই রোগের সংক্রমণ ঘটেছে। সেহেতু সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮ এর ১১(১) ধারার ক্ষমতাবলে সমগ্র বাংলাদেশকে সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করা হলো।’
বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেন, দেশে করোনা সংক্রমণ চতুর্থ ধাপে পৌঁছেছে। অর্থাত্ এখন অধিকাংশই সংক্রমণ বহন করছে এটা ধরে নিয়ে করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এদিকে দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ১০ জন মারা গেছেন। এ সময় করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন ৩৪১ জন। দেশে করোনায় এক দিনে মৃত্যু ও শনাক্তের এই সংখ্যা সর্বোচ্চ। এ নিয়ে দেশে করোনায় মোট মারা গেছেন ৬০ জন। আর মোট শনাক্তের সংখ্যা ১ হাজার ৫৭২ জন।
এদিকে করোনা ভাইরাসের প্রার্দুভাব বেড়ে যাওয়ায় আরো চারটি হাসপাতালকে ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এগুলো হলো : শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট, মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। এসব হাসপাতালের রোগীদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করে প্রয়োজনীয় চিকিত্সা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাবে ডাক্তারদের আতঙ্ক কাটছে না। ডাক্তারদের শতভাগ নিরাপত্তা এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এটাকে স্বাস্থ্য বিভাগের ব্যর্থতা মনে করছেন চিকিত্সকরা।
বিশেষ করে সিলেটের ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মঈন উদ্দীন মারা যাওয়া পর চিকিত্সক, নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের মধ্যে বেশ আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেক ডাক্তার-নার্সের পরিবার তাদের কর্মস্থলে যেতে বাধা প্রদান করছেন। কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালসহ অনেক হাসপাতালে ডাক্তার পিপিই পেলেও নার্সরা পাচ্ছেন না। আবার ডাক্তার-নার্সরা পেলেও সুইপাররা পাচ্ছেন না। অথচ রোগীর চিকিত্সায় পুরো টিমকেই পিপিই দিতে হয়।
অন্যদিকে, করোনায় আক্রান্তের খবর গোপন রেখে বিপদ বাড়াচ্ছেন রোগীরা। সম্প্রতি মিটফোর্ড হাসপাতালে এক রোগীকে অপারেশন করতে গিয়ে ধরা পড়ে তার করোনা আক্রান্তের তথ্য। এ কারণে ঐ অপারেশনের সঙ্গে যুক্ত ১১ জন ডাক্তার-নার্সকে কোয়ারেন্টাইনে যেতে হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখ্য চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, করোনাযুদ্ধে ডাক্তাররা হলেন প্রধান সৈনিক। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে উত্সাহ দিতে হবে। চিকিত্সাসেবার সঙ্গে জড়িত পুরো টিমকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
বিএসএমএমইউর অ্যানেসথেসিয়া, এনালজেসিয়া অ্যান্ড ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. দেবব্রত বণিক বলেন, ডাক্তার, নার্স ও চিকিত্সাসেবাকর্মীদের যে ধরনের নিরাপত্তা দেওয়া প্রয়োজন তা দেওয়া হয়নি। এ কারণে ডাক্তাররা ভয়ে কাজ করেন না। তাদের নিরাপত্তা আগে নিশ্চিত করতে হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার করোনা ভাইরাস নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত অনলাইন ব্রিফিংয়ে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ২ হাজার ১৩৫টি। এর মধ্যে ২ হাজার ১৯টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। ব্রিফিংয়ে বলা হয়, যে ১০ জন মারা গেছেন, তাদের মধ্যে পুরুষ সাত জন। আর নারী তিন জন। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছয় জনই ঢাকার। বাকিরা ঢাকার বাইরের। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সি এক জন, ৫১ থেকে ৬০ বছর বয়সি তিন জন, ষাটোর্ধ্ব পাঁচ জন এবং সত্তরোর্ধ্ব এক জন রয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় আরো ৩৭ জনকে আইসোলেশনে নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে এখন ৪৬১ জন আইসোলেশনে আছেন।
৪৩ জেলায় এই পর্যন্ত ১ হাজার ৫৭২ জন কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়েছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ঢাকায় ৫৪৬ জন, নারায়ণগঞ্জে ২১৪ জন, গাজীপুরে ৫৩ জন, চট্টগ্রামে ৩১ জন, নরসিংদীতে ২৮ জন, মুন্সীগঞ্জে ২১ জন, মাদারীপুরে ১৯ জন, কিশোরগঞ্জে ১৭ জন, কুমিল্লায় ১৪ জন, গাইবান্ধা ও জামালপুরে ১২ জন করে, বরিশালে ১০ জন, গোপালগঞ্জ ও টাঙ্গাইলে ৯ জন করে করোনা ভাইরাসের রোগী পাওয়া গেছে। এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আট জন, দিনাজপুর ও ময়মনসিংহে সাত জন করে, চাঁদপুর, নীলফামারী ও রাজবাড়ীতে ছয় জন করে, মানিকগঞ্জ ও শরিয়তপুরে পাঁচ জন করে, বরগুনা, নেত্রকোনা, পিরোজপুর ও রাজশাহীতে চার জন করে, ঝালকাঠি, শেরপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ে তিন জন করে, ফরিদপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, মৌলভীবাজার, পটুয়াখালী ও রংপুরে দুই জন করে এবং চুয়াডাঙ্গা, কক্সবাজার, হবিগঞ্জ, খুলনা, লক্ষ্মীপুর, নড়াইল, নোয়াখালী ও সুনামগঞ্জে এক জন করে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে এরই মধ্যে ৪৮টি জেলা লকডাউন করেছে প্রশাসন। এর বাইরেও কিছু উপজেলা এবং কিছু অঞ্চলে লকডাউন জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন।