সাধন সরকার
এ মুহূর্তে পৃথিবীর আকাশে-বাতাসে করোনা ভাইরাসের আধিপত্য! নিজের নিশ্বাসকেও এখন বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে! সদা ব্যস্ত পৃথিবীর মানুষগুলো যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। চেনা পৃথিবীর আজ কত অচেনা! এমন বিশ্ব, এমন বাংলাদেশ, এমন রাজধানী ঢাকা শহর কখনো কেউ দেখেনি! বারবার সতর্কবাণী ভেসে আসছে—‘খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হবেন না, ঘরে থাকুন; নিরাপদে থাকুন।’ তবু গরিবের পেট কোনো বাধা মানে না! রিকশা-ভ্যান চালক, বস্তিবাসী, পোশাক শ্রমিক, গরিব দিনমজুর, দিন এনে দিন খাওয়া মানুষগুলো বৈশ্বিক এ মহামারিতে অসহায়ের চেয়ে আরো বেশি অসহায়।
করোনাকালের এ মুহূর্তে ভরসা দেখিয়ে যাচ্ছেন ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে যুক্ত পেশার মানুষেরা। সেবা দিতে গিয়ে অনেকের জীবনও আজ বিপন্ন! করোনার কাছে ধনী-গরিব, উঁচু-নিচুর কোনো ভেদাভেদ নেই! মানবতার সংকটের এ ক্ষণে অনেকে ‘মানবতার ডাকঘর’ খুলে গরিবের ঘরে খাবার পৌঁছে দিচ্ছে। আবার সার্বিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয়হীনতাও লক্ষ করা যাচ্ছে! করোনাকালেও বায়ুসূচকে অন্য শহরের তুলনায় ভালো করতে পারছে না ফাঁকা ঢাকা! যুক্তরাষ্ট্রের বোষ্টনের হার্ভার্ড টিএইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের গবেষকদের মতে, বায়ুদূষণে করোনায় মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি। মূলত দূষিত বায়ু শ্বাসকষ্টজনিত ঝুঁকি বাড়িয়ে করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত রোগীর জন্য মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
এ মুহূর্তে মশককুলের অত্যাচারে ডেঙ্গুর ভয়ও নগরবাসীর জন্য চিন্তার কারণ! এর মাঝেও কিছু খবর আশা জাগায়, এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখায়। ক্ষদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য প্রণোদনা, প্রবাসীদের জন্য প্রণোদনা, গরিবদের জন্য প্রণোদনা, স্বাস্থ্যখাতের জন্য প্রণোদনা, কৃষকদের জন্য প্রণোদনাসহ সার্বিক অর্থনীতিতে খাতভিত্তিক প্রণোদনার খবর নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে সাহস জোগাচ্ছে। যদিও কেউ জানে না করোনাকাল কতদিন পর্যন্ত তার মরণথাবা চালিয়ে যাবে! যেহেতু বর্তমান পরিস্থিতিতে কাজ বন্ধ করে ঘরে থাকতে বলা হয়েছে, সেহেতু দিন আনা দিন খাওয়া মানুষগুলোর পেট চালানোর দায়িত্ব কিছুদিনের জন্য হলেও সরকারের ওপরই বর্তায়। বৈশ্বিক মহামারির এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ বাড়িভাড়া, বিদ্যুত্, গ্যাস, পানি, পৌর কর ইত্যাদি হয় রেয়াত, না হয় মওকুফ করে দেওয়ার ব্যবস্থা নিয়েছে। আমাদের দেশেও এমনটি ভাবা যেতে পারে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এত বড়ো দুর্যোগ পৃথিবীতে আর আসেনি! সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে ঐক্যবদ্ধ মানুষ কখনো হারেনি, হারবে না। যুগে যুগে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সার্স, ইবোলা, হাম, যক্ষ্মা, প্লেগ, স্প্যানিশ ফ্লুসহ অনেক বড়ো বড়ো দুর্যোগে মানবজাতি লড়াই করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। মানুষ মরে যেতে পারে, কিন্তু মানুষের লড়াই কখনো মরে না। বলা হচ্ছে, করোনা পরবর্তী পৃথিবীর অনেক কিছু বদলে যাবে! তবে যাই হোক না কেন, এ ধরণীতে মানবিকতাকে বাঁচিয়ে রাখতেই হবে। কেননা করোনাকালের এ সংকটময় মুহূর্তে মানবিকতা, সহানুভূতি ও সতর্কতা বজায় রেখে এগিয়ে যাওয়া অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি। মানুষের জয় হবেই।
ঢাকা