এক দিনে ১৫ জনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এক দিনে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়েছে গতকাল। শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ২ হাজার ১৯০টি নমুনা পরীক্ষা করে আরো ২৬৬ জনের মধ্যে এ ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ায় আক্রান্তের মোট সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৮৩৮ জন হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে গত এক দিনে সুস্থ হয়েছেন আরো ৯ জন। এ পর্যন্ত মোট ৫৮ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম রোগীর খোঁজ মেলে গত ৮ মার্চ; তার ১০ দিনের মাথায় ঘটে প্রথম মৃত্যু।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে যুক্ত হয়ে দেশে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির এই সর্বশেষ তথ্য তুলে ধরে জানান, কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ৩৩ শতাংশ হাসপাতালে গিয়ে সেবা নিয়েছেন। বাকিরা হোম ও প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে আছেন। গত পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে ২৭ জন রোগীকে অর্থাত্ মোট আক্রান্তের ১.৮ শতাংশকে আইসিইউতে রেখে চিকিত্সা দিতে হয়েছে। এই হার থেকে বলা যায়, ১০ হাজার আক্রান্তের মধ্যে যাদের আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন তাদের আইসিইউ সাপোর্ট দিতে ৮০টি ভেন্টিলেটর লাগবে। এই সাপোর্টও এক বারে লাগবে না, বিভিন্ন সময়ে এটা লাগবে।
এদিন স্বাস্থ্য বুলেটিনে যুক্ত হয়ে আক্রান্তদের বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যান তুলে ধরেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত আক্রান্ত ১ হাজার ৮৩৮ জন রোগীর মধ্যে ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সিদের সংখ্যা বেশি, ২১ শতাংশ। এরপরে ৩১-৪০ বছর বয়সিদের মধ্যে আক্রান্তের হার ১৯ শতাংশ, ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে আক্রান্তের হার ১৫ শতাংশ। মোটামুটিভাবে আমরা দেখতে পাই ২১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি। আক্রান্তদের মধ্যে ৬৮ শতাংশই পুরুষ। এলাকাভিত্তিক বিশ্লেষণ তুলে ধরে ডা. ফ্লোরা বলেন, এ পর্যন্ত আক্রান্তদের মধ্যে ৪৬ শতাংশ ঢাকা শহরের বাসিন্দা; ২০ শতাংশ নারায়ণগঞ্জের। তিনি জানান, নতুন করে গাজীপুর জেলায় রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া চট্টগ্রাম ও মুন্সীগঞ্জেও রোগী বাড়ছে। রাজধানীতে মিরপুর এলাকায় কোভিড-১৯ এর প্রকোপ এখন পর্যন্ত বেশি। মোট আক্রান্তদের মধ্যে ১১ শতাংশ ঐ এলাকার বাসিন্দা। এছাড়া ৪ শতাংশ করে রোগী মোহাম্মদপুর, ওয়ারী, যাত্রাবাড়ী এলাকার। আর ৩ শতাংশ করে রোগী উত্তরা ও ধানমন্ডি এলাকার।
করোনা আক্রান্তদের ৮০ শতাংশের চিকিত্সার দরকার হয় না : স্বাস্থ্যমন্ত্রী
করোনা ভাইরাস আক্রান্তদের ৮০ শতাংশের কোনো চিকিত্সার ‘প্রয়োজন হয় না’ বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি বলেন, করোনা আক্রান্তের ৮০ পারসেন্টের বেশি কোনো চিকিত্সার প্রয়োজন হয় না। অন্যদের অক্সিজেন সাপোর্ট ও কিছু ওষুধ লাগতে পারে। মন্ত্রীর এই কথায় সায় দিয়ে আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, আক্রান্তদের শতকরা ৩২ ভাগের হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল না। বিভিন্ন কারণে তাদের হাসপাতালে যেতে হয়। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া সিলেটের ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের সহকারী অধ্যাপক মঈন উদ্দিন যখন বেশি অসুস্থ হয়েছিলেন, তখন সিলেট ভেন্টিলেটর সাপোর্টসহ করোনা কেয়ার ইউনিট ও আইসোলেশন সেন্টার না থাকার বিষয়টি সামনে চলে আসে। তা নিয়ে বিস্তর সমালোচনা হয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। এর জবাব দিতে গিয়ে জাহিদ মালেক বলেন, আইসিইউ, ভেন্টিলেটর নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। প্রস্তুতি নিয়ে হচ্ছে। এ ব্যবস্থা প্রতিনিয়ত উন্নত হচ্ছে।
চিকিত্সকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা সরঞ্জাম-পিপিই নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘পিপিইর সংকট নেই। পিপিই তৈরি করতে সময় লেগেছে কারণ পিপিইর কাঁচামাল দেশে ছিল না, রপ্তানি বন্ধ ছিল এবং প্রস্ততকারকও তেমন ছিল না। আমরা আস্তে আস্তে প্রস্তুতকারক তৈরি করেছি। আমরা প্রায় ১ লাখ পিপিই সারা বাংলাদেশে প্রতিদিন দিচ্ছি। এই সক্ষমতা আমরা অর্জন করেছি।’ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাতে এখন ৩ লাখ ৯৬ হাজার ১৫২টি পিপিই মজুত রয়েছে বলে জানান তিনি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, সব বিভাগীয় হাসপাতালে আইসিইউসহ ২০০ শয্যা কোভিড-১৯ রোগীদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আর জেলা শহরে হাসপাতালের ৫০ থেকে ১০০ শয্যা এরই মধ্যে প্রস্তুত হয়েছে। ঢাকার বেসরকারি ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ১০০ শয্যা এবং আনোয়ার খান মডার্ন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ২০০ শয্যা তৈরি রয়েছে।