করোনার ঝুঁকিতে পথশিশু

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও করোনা ভাইরাসের মহামারি দেখা দেওয়ায় মানুষকে যথাসম্ভব ঘরে থাকিবার নির্দেশ দেওয়া হইতেছে। যেহেতু করোনা ভাইরাসের কোনো ঔষধ বা প্রতিষেধক নাই, এই জন্য হোম কোয়ারেন্টাইন মানিয়া চলা তথা ঘরে অবস্থান করাটাই শ্রেয়; কিন্তু যাহারা পথশিশু তাহারা কীভাবে এই নিয়ম মানিয়া চলিবে? তাহাদের ঘরই যে নাই! পথই তাহাদের ঠিকানা। এইজন্য তাহারা এখনো রাস্তাঘাটে অসচেতনভাবে অবস্থান করিতেছে। কখনো কখনো দল বাঁধিয়া ঘোরাঘুরি করিতেছে। রাত্রি যাপন করিতেছে ফুটপাতে। এইজন্য তাহাদের মধ্যে করোনায় আক্রান্ত হইবার ঝুঁকি বাড়িতেছে ক্রমশ। শহরের পার্ক, ফুটপাত, রেলস্টেশন, বাসস্টেশন, ফেরিঘাট, লঞ্চ টার্মিনাল, কাঁচাবাজার প্রভৃতি স্থানে থাকা পথশিশুদের এই মহামারি পরিস্থিতিতে সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। তাহা না হইলে তাহাদের মাধ্যমে আরো ব্যাপকসংখ্যক মানুষ করোনায় আক্রান্ত হইতে পারে।

বাংলাদেশে পথশিশুর সংখ্যা লইয়া সুনির্দিষ্ট কোনো জরিপ নাই। কেহ বলেন ২০ লক্ষ, আবার কেহ বলেন ২৫ লক্ষ। কেবল ঢাকা শহরেই রহিয়াছে কমপক্ষে ৬-৭ লক্ষ। আর অর্ধলক্ষ শিশু আক্ষরিক অর্থেই সর্বদা রাস্তায় থাকে। এই সকল পথশিশুর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ টোকাই। তাহারা ফালাইয়া দেওয়া জিনিসপত্র সংগ্রহ ও বিক্রয় করিয়া জীবিকা নির্বাহ করে। তাহারা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ হইতে এই সকল জিনিসপত্র সংগ্রহ করে বলিয়াও করোনায় আক্রান্ত হইতে পারে। আরেক শ্রেণির পথশিশু আছে যাহারা ভিক্ষুক। তাহারা বিদেশি নাগরিক, প্রবাসী বা করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসিয়া এই ভাইরাসে আক্রান্ত হইতে পারে। বাংলাদেশে এই সকল পথশিশুর দেখাশোনার জন্য সরকারি-বেসরকারিভাবে বিভিন্ন প্রকল্প রহিয়াছে। কয়েক স্থানে তৈরি করা হইয়াছে পথশিশুদের আশ্রয়কেন্দ্র। ঢাকার কাওরান বাজার ও কমলাপুরে চালু করা হইয়াছে দুইটি সরকারি হোম। এই সকল উদ্যোগ যে অপর্যাপ্ত, তাহা আমরা জানি। আমাদের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথাও অজানা নহে। তবে গত কয়েক দশক ধরিয়া তাহাদের জন্য যেই সকল সুযোগ-সুবিধা গড়িয়া তোলা হইয়াছে, এই মুহূর্তে প্রয়োজন তাহার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার। কিছু পথশিশু আছে যাহারা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজেরাই বিভিন্ন হোম কিংবা আশ্রয়কেন্দ্রে চলিয়া আসে; কিন্তু অনেক পথশিশু রহিয়াছে, যাহারা পরিস্থিতি যতই কঠিন হউক না কেন, তাহারা আশ্রয়কেন্দ্রে আসিতে চাহে না। এই সকল ঝুঁকিপূর্ণ শিশুকে টার্গেট করিয়া তাহাদের সুরক্ষা দিতে হইবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লক্ষ করা যাইতেছে, ছিন্নমূল মানুষের এই সময় মহামারির হাত হইতে রক্ষায় বিশেষ কর্মসূচি পালন করা হইতেছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট লোকজন রাস্তায় রাস্তায় গিয়া সম্ভাব্য করোনা রোগীদের টেস্ট করিতেছে এবং প্রয়োজনে জোর করিয়া সেফ হোম বা হাসপাতালে পাঠাইতেছে। আমাদের দেশেও ছিন্নমূল মানুষ ও পথশিশুদের জন্য এই সময়ে নিয়মিত ত্রাণ কর্মসূচি পালন ও চিকিত্সার ব্যবস্থা করা আবশ্যক। সবচাইতে আশঙ্কার কারণ হইল, সংক্রমণ কীভাবে ছড়ায় সে সম্পর্কে পথশিশুদের কোনো ধারণাই নাই। আবার এই ধরনের রোগের লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা দিলে তাহারা পরীক্ষানিরীক্ষা করিবে এমন সম্ভাবনাও কম। এইজন্য সময় থাকিতেই তাহাদের ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হইবে। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান এই ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করিতে পারে।