বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের আক্রমণ ও করণীয়

ড. মো. মামুন আশরাফী (এইচসি)

প্রায় কয়েক মাস যাবত্ জল-স্থল ও আকাশপথে বন্ধ হয়ে গেছে আন্তর্জাতিক সব যোগাযোগব্যবস্থা; প্রায় বন্ধের মুখে সব ব্যবসা-বাণিজ্য; অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যাবস্থাও বন্ধ হয়ে গেছে দেশে দেশে; মূলত বিশ্ব এখন করোনা ভাইরাস নামের এই সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অণুজীবের ভয়াল আক্রমণে পৃথিবীকে স্থবির এক মৃত্যু-আতঙ্কিত জনপদে পরিণত করে তুলেছে। করোনা ভাইরাসের কার্যকর কোনো চিকিত্সা পদ্ধতি কিংবা ভ্যাকসিন পৃথিবীর কোনো দেশেই এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। তাই এ পর্যন্ত যতটুকু অগ্রগতি হয়েছে, তা হলো এ ভাইরাস যেন অঞ্চলে অঞ্চলে গ্রামে গ্রামে কোনোভাবেই ছড়িয়ে পড়তে না পারে তার জন্য সর্বোচ্চ প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা। এই প্রতিরোধব্যবস্থার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কার্যকর প্রতিরোধ হচ্ছে লকডাউন পদ্ধতি। চীন এ পদ্ধতি ব্যবহার করে উহান শহরে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে পেরেছে। সরকারকে ধন্যবাদ যে তারা একটা যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যে গুরুত্বসহকারে এই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

বর্তমান বিরাজমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, ১৮ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছাড়া লকডাউনের মতো বিপুল জনসম্পৃক্ত একটি আপত্কালীন ব্যবস্থা কার্যকর করা মোটেও সম্ভব নয়। জনগণ যেন ঘরবন্দি থাকে এবং বাইরে বের না হয়, সেজন্য প্রথম ও প্রধান সমস্যা উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের পাশাপাশি মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ যারা দৈনিক কাজ ও আয়ের ওপর নির্ভরশীল, সরকার নিশ্চয়তা প্রদান করেছে যে লকডাউন চলাকালীন তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী বিনামূল্যে প্রদান করা হবে। জেলা ও পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে এই খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে এতে ছাত্রদের অংশগ্রহণ থাকলে আমরা ভবিষ্যতের যে কোনো দুর্যোগে তাদের সহায়ক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারব।

সরকার গৃহীত চিকিত্সাসেবা প্রেক্ষিত :সমস্যা ও তার সম্ভাব্য সমাধানকল্পে আমার পরামর্শ

টেস্টিং কিট ও টেস্ট :আমাদের প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণ টেস্ট করা দরকার। কারণ যত বেশি টেস্ট করে আমরা পজিটিভ রোগীকে আলাদা করে রাখতে পারব, ততই সংক্রমণের ঝুঁকি কমে আসবে। তাই আমার পরামর্শ হলো, আমাদের সাধ্যের সর্বোচ্চ পর্যায়ের চেষ্টায় অতিদ্রুত টেস্টিং কিট উত্পাদন করতে হবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রতিটি জেলায় যে টেস্টিং ল্যাব স্থাপন করছে, তা অতিদ্রুত সম্পন্ন করে যত বেশি সম্ভব টেস্ট করতে হবে। প্রতিদিন  প্রতি জেলায় অন্তত ৫০০ ব্যক্তির টেস্ট করতে হবে এরকম একটি বাস্তবানুগ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কোনো সময় নষ্ট না করে কাজ শুরু করে দিতে হবে। এর জন্য সরকারের  প্রয়োজনীয় লোকবল রয়েছে আর না থাকলে স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের সেখানে নিয়োগ করতে হবে। যাদের পজিটিভ পাওয়া যাবে, তাদেরই আইসোলেশনে নিতে হবে, যাতে তারা অন্য কাউকে সংক্রমিত করতে না পারে। এ ক্ষেত্রে আক্রান্তদের হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ, কমিউনিটি সেন্টার, হোটেল, স্টেডিয়ামগুলোকে প্রস্তুত করে সেখানে রাখা যেতে পারে।

আর যারা ইতিমধ্যে আক্রান্ত হয়ে গেছেন, তাদের আমাদের চিকিত্সক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা যতটুকু সাধ্য আছে তার সর্বোচ্চটুকু দিয়ে তাদের চিকিত্সা করবেন। আর যারা সৌভাগ্যক্রমে নেগেটিভ রয়ে যাবেন, তাদের চলে যেতে হবে কঠোর ঘরবন্দি অবস্থায়; যেন তারা কারো মাধ্যমে আক্রান্ত না হন এবং অপরকে আক্রান্ত না করেন। এক কথায়, লকডাউন পরিপূর্ণভাবে মেনে চলতে হবে।

চিকিত্সকদের জন্য প্রয়োজনীয় পারসোনাল প্রোটেকটিভ ইকুইপমেন্ট বা পিপিই :ছোঁয়াচে ভাইরাসের আক্রমণের সরাসরি ঝুঁকি থাকায় চিকিত্সকেরা পিপিই ছাড়া রোগীকে স্পর্শ করতে পারবেন না। কারণ এতে করে তারাও সংক্রমিত হবেন এমনকি কয়েক জন চিকিত্সক ও নার্স ইতিমধ্যে আক্রান্ত হয়েছেনও। এমনকি এখন পর্যন্ত বেশ কয়েক জন চিকিত্সক-নার্স আক্রান্ত হওয়ায় তারা কোয়ারেন্টাইনে আছেন এবং ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের বেশ কয়েকটি হাসপাতাল লকডাউন করা হয়েছে। তবে আশার কথা এই যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চিকিত্সক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য যথেষ্ট পিপিই ও টেস্টিং কিট সংগ্রহ করেছে বলে বক্তব্য দিয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও চিকিত্সক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বিভিন্ন রকম প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে এই প্রণোদনা তাদের আর্তমানবতার পাশে দাঁড়াতে  উত্সাহিত করবে।

অন্যান্য দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে মে মাসের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে বাংলাদেশকে একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির  মুখোমুখি পড়তে হতে পারে। রোগীর সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে আমাদের আশঙ্কার সঙ্গে হাত ধরাধরি করে। আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছি যে এ রোগের চিকিত্সার জন্য কোনো ভ্যাকসিন এখনো পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। রোগীর শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধক্ষমতাই একমাত্র ভরসা। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো লকডাউন শতভাগ মেনে চলা। আর তা না মানলে নিজের পায়ে শুধু নয়; এই জাতির পায়ে জেনেশুনে কুড়াল মারা হবে। লকডাউন মানতে প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করলেও জনগণ তা মেনে নেবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আর রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকলে আমাদের সীমিত সম্পদ দিয়ে তাদের সবাইকে চিকিত্সা দেওয়ার সক্ষমতা আমাদের আছে কি? এটিই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আর আমার সমস্ত আশা লুকিয়ে রয়েছে এই প্রশ্নের উত্তরের ভেতরে। বাস্তবতা হলো, এত রোগীর একসঙ্গে চিকিত্সা দেওয়ার সক্ষমতা আমাদের নেই। সুতরাং প্রতিরোধকল্পে কঠোরভাবে লকডাউন পালন করাই  হচ্ছে আমাদের জন্য সহজ সমাধান।

n লেখক : পর্যটন বিশেষজ্ঞ