মধুপুরে পাকা কলা যাচ্ছে বানর-হনুমানের পেটে

বাজারজাতকরণে সমস্যা

গোপালপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা

মধুপুর-ময়মনসিংহ সড়কের চাড়ালজানি ফরেস্ট রেঞ্জ অফিস বামে রেখে পাকা সড়ক গেছে গুবুদিয়া হয়ে চুনিয়া। এ সড়কে ১০ কদম হাঁটলেই দুই পাশে চোখে পড়ে শুধু কলা আর কলা বাগান। আশপাশের মাগন্তিনগর, জাঙ্গালিয়া, ময়ূরপাড়া, চুনিয়া, ইদিলপুর, বেড়িবাইদ, জলছত্র. হরিণধরা, জালাবাদা, গেচুয়া, রাজাবাড়ী, গায়রা, সাতারিয়া এবং শোলাকুড়ি থেকে ধরাটি পর্যন্ত ৪০ গ্রামে শুধুই কলার রাজত্ব।

মধুপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের মতে, এবার কলা চাষ হয়েছে প্রায় ১০ হাজার একর। কলা চাষ, বাজারজাত, বিপণন ও পরিবহনের সঙ্গে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। মার্চ হতে মে কলার রমরমা বাজার। কিন্তু করোনার কারণে এবার কলার বাজারে ধস নেমেছে। চুনিয়া গ্রামের দুলাল মিয়া ২১ একরে কলা আবাদ করেছেন। করোনার কারণে ভোক্তা কম। চট্টগ্রাম ও ঢাকার পাইকাররা কলা কিনতে আসছে না। তার বাগানের প্রায় ১৪ লাখ টাকার পরিপক্ক কলা বিক্রি হচ্ছে না। প্রতিদিন এ কলা পেকে বিনষ্ট হচ্ছে। জাঙ্গালিয়ার চাষি শাহাবুদ্দীন জমি বন্ধকীর টাকায় ছয় একরে সাগর কলার আবাদ করেছেন। এক মাস আগে কুমিল্লার পাইকার বাগানের সব কলা কেনার চুক্তিতে বায়নার ১ হাজার টাকা দিয়ে যান। আজ ফোনে সাফ জানিয়েছেন তিনি কলা কিনবেন না। অথচ বাগানের কলা প্রতিদিনই পেকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আর বানর-হনুমান তা খাচ্ছে। খেতের পরিপক্ক ও পাকা কলা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন জলছত্রের চাষি তৌহিদুল ইসলাম বিপ্লব, গাছাবাড়ীর সুমন আহমেদ, ধরাটির  মছলিম উদ্দীন, গায়রার হাবিবুর রহমান, আলম মিয়া ও শাহাবুদ্দীন, সাধুপাড়ার ওয়াদুদ আলী এবং মধুপুরের শরীফ হোসেন ও সালাম মিয়া। তারা কেউ ১০ থেকে  ৮০ একর পর্যন্ত কলা চাষ করেছেন। কিন্তু বাজারজাত ও বিপণন সমস্যায় কলা বিক্রি হচ্ছে না।

মধুপুর উপজেলা কলা চাষি সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম জানান, লকডাউন থাকায় দূরের পাইকাররা আসছেন না। কলা বিক্রি হচ্ছে না। গার্মেন্টস ও ফুটপাতের দোকান বন্ধ থাকায় আড়তদাররা কলা নিতে চান না। যে ছড়ি ৪০০-৫০০ টাকায় বিক্রি হতো তা এখন ১০০ টাকায়ও বিকাচ্ছে না। জলছত্র কাঁচামাল সংরক্ষণ সমিতির সভাপতি তারা মিয়া জানান, পাইকারি বাজারে কিছু কলা উঠলেও ক্রেতা কম। ফলে এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত প্রায় ৭০০ দালাল ও ফড়িয়া এখন বেকার। জলছত্র কুলি-মজুর সমিতির আহ্বায়ক আবুল কাশেম জানান, কলা বেচাকেনা বন্ধ থাকায় প্রায় ৪০০ লেবারের হাতে কোনো কাজ নেই। এরা অনাহারে অর্ধাহারে দিনযাপন করছে। জলছত্র ট্রাকডাইভার্স ইউনিয়নের আহ্বায়ক আমীর আলী জানান, হাটের দিন কলা ভর্তি শতাধিক ট্রাক দেশের বিভিন্ন স্থানে চালান নিয়ে যেত। এখন তিন-চার ট্রাক কলা শুধু আশপাশের জেলায় চালান নিয়ে যায়। ট্রাক ড্রাইভার আবুল হাফিজ জানান, কলা নিয়ে চিটাগাং বা বরিশাল গেলে পথিমধ্যে কোনো খাবারের হোটেল পাওয়া যায় না। আর খালি ট্রাক নিয়ে ফেরার সময় পথে পথে রাস্তার মাস্তানদের চাঁদা দিতে হয়। আদিবাসী গারো নেতা ইউজিন নকরেক জানান, বাগানের পাকা কলা বিনষ্ট হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে না মধুপুর জঙ্গলের বানর-হনুমান। এরা দল বেঁধে পাকা কলায় উদরপূর্তি করছে। মধুপুর উপজেলা কৃষি অফিসার মাহমুদুল হাসান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, এখানে কলা সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় বাগান থেকে পর্যায়ক্রমে ফল উঠানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে কৃষকদের।