অসচেতনতার নেপথ্যে

এ কে এম নাজমুল হাসান

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মহামারি করোনা এখন বাংলাদেশে বেশ শক্তভাবেই জেঁকে বসেছে। দেশে প্রতিনিয়তই বৃদ্ধি পাচ্ছে এর দাপট। মোট আক্রান্তের সংখ্যা শত স্পর্শ করতে যেখানে লেগেছিল প্রায় এক মাস সেখানে এখন প্রতি ২৪ ঘণ্টায়ই আক্রান্ত হচ্ছে শতাধিক।

সংক্রমণ রোধে সকল ধরনের জনসমাগম এড়িয়ে চলতে বলা হচ্ছে বহু আগে থেকেই। সকল ধরনের গণজমায়েতের ওপরও দেওয়া হয় নিষেধাজ্ঞা। আর সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতে দেশব্যাপী সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন তো পুরোনো খবর।

কিন্তু এত কিছুর পরও মানুষকে ঘরে রাখা যাচ্ছে না। কারণে-অকারণে বেরিয়ে আসা জনতাকে জরিমানা করেও আটকাতে হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের হাটবাজারগুলোর ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। তাছাড়া ঢাকার বিভিন্ন প্রবেশপথে তল্লাশি চৌকি বসিয়েও ঠেকানো যাচ্ছে না জনচলাচল। নানা ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়ে লোকজন ঢাকা থেকে ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেশে সেই সঙ্গে করোনা ভাইরাসও। রাজশাহী জেলার প্রথম করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিটি ট্রাকে করে ঢাকা থেকে সেখানে গিয়েছে। এছাড়া বেশ কিছু নতুন আক্রান্ত জেলার রোগীরাও ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ থেকে গিয়েছে এমন তথ্য নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন। ফলশ্রুতিতে নানা জায়গায় দাবি উঠেছে কারফিউ জারির।

স্বাভাবিকভাবেই এখন প্রশ্ন জাগছে বিশ্বব্যাপী এরূপ ভয়াবহ পরিস্থিতির পরও মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হচ্ছে না কেন? এর নেপথ্যের কারণগুলো কি কি?

মানুষের এই অসচেতনতার নেপথ্যে মূলত তিনটি কারণ রয়েছে।

১. করোনা ভাইরাস সম্পর্কে মানুষের মধ্যে বিদ্যমান ভ্রান্ত ধারণা সচেতনতার প্রথম অন্তরায়। এই ভ্রান্ত ধারণা তৈরিতে সামাজিক, ভৌগোলিক, ধর্মীয়সহ বেশকিছু নিয়ামক কাজ করেছে। প্রথম দিকে ভাইরাসটি সম্পর্কে বেশ কিছু অসত্য তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যেমন : উষ্ণ আবহাওয়ায় করোনা টিকতে পারে না, শ্বাস বন্ধ করে করোনা পরীক্ষা করা ইত্যাদি। যার কারণে কেউ কেউ মনে করে ভৌগোলিক কারণে আমাদের আবহাওয়া এখন উষ্ণ হওয়ায় করোনা এখানে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না।

২. দ্বিতীয় যে কারণটি তা হলো— জীবিকার তাগিদ। কবি সুকান্তের ভাষায় বলতে গেলে “ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়”। দেশের মোট জনসংখ্যার বিরাট একটা অংশ দিনমজুর। একদিন কাজ না করলে যাদের সংসার চলবে না সেই মানুষগুলো শত ভয়-বাধা সত্ত্বেও জীবিকার তাগিদে ঘর থেকে বের হচ্ছে। কেননা জীবিকা যেখানে অনিশ্চিত করোনার ভয় সেখানে বিলাসিতা। তাদের কাছে করোনায় মরা আর না খেয়ে মরা একই কথা। যার কারণে এই লকডাউনের মধ্যে মানুষ শারীরিক দূরত্ব উপেক্ষা করে রাস্তায় নামছে ত্রাণের জন্য।

৩. সবশেষে ৩য় কারণটি হলো— অযৌক্তিক মানুষের এই অদ্ভুত আচরণ। তারা ঘরে থাকা উচিত জেনেও অপ্রয়োজনে বাহিরে ঘোরাফেরা করে।

উপরিউক্ত অন্তরায়গুলো দূর করে সচেতনতা তৈরি করাটা এখন অতীব জরুরি। প্রথমেই প্রচারণার মাধ্যমে ভাইরাস সম্পর্কিত বিভ্রান্তিগুলো দূর করতে হবে। যারা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া ঘরে ঘরে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার যে ঘোষণা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন অতিদ্রুত যথাযথভাবে সেটা বাস্তবায়ন করতে হবে। আর অযৌক্তিক মানুষদের জন্য কঠোর আইন প্রয়োগের বিকল্প নেই। অন্যথায় করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়াটা দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়