গৃহবন্দি শিশুদের প্রতি বেশি মনোযোগ দিতে পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

ঘরের মধ্যে বড়োরা উদ্বিগ্ন থাকলে শিশুদের মনেও প্রভাব পড়ে। এমনকি বড়োদের বিষণ্নতাও শিশুদের অস্বাভাবিক করে তুলতে পারে। ফলে এই পরিস্থিতিতে গৃহবন্দি শিশুদের সামনে করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে আলোচনা না করাই শ্রেয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি পারিবারিক বন্ধন আরো মজবুত করতে শিশুদের বেশি করে সময় দেওয়ার কথাও বলছেন তারা। অস্বাভাবিক বা শিশুদের হিংস্র আচরণ লক্ষ্য করলে তাদের নিয়ে বাড়ির ছাদে বা গ্রাউন্ড ফ্লোরে যদি খেলার জায়গা থাকে সেখানেও সময় কাটাতে বলছেন তারা।

বাংলাদেশ শিশু চিকিত্সক সমিতির সভাপতি ও শিশু হাসপাতালের সাবেক পরিচালক   অধ্যাপক ডা. মনজুর হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, ‘এখন কোনোভাবেই বাচ্চাদের বিরক্ত করা যাবে না। এই সময়টাতে তাদের একটা রুটিন করে দিতে হবে। লেখাপড়ার পাশাপাশি টিভি দেখা বা ঘরের মধ্যে অন্য ধরনের খেলাধুলার (লুডু, দাবা, ক্যারাম) ব্যবস্থা করতে হবে। নিয়মিত তাদের স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন করতে হবে। বয়স ভেদে শিশুদের রুটিন ঠিক করতে হবে। যারা একটু বড়ো হয়েছে তাদের একটা নির্দিষ্ট সময় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহার করতে দিতে হবে। না হলে তারা বিদ্রোহী হয়ে যেতে পারে। আবার যারা এখনো স্কুলে যায়নি অর্থাত্ তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সের শিশুদের সঙ্গে অবশ্যই অভিভাবকদের অনেক বেশি সময় দিতে হবে। এই সুযোগে পারিবারিক বন্ধনটাও অটুট করার সুযোগ থাকছে আমাদের সামনে।’

আপাতদৃষ্টিতে পরিস্থিতির বিবেচনায় শিশুদের বিষয়টিকে খুব সামান্য মনে হলেও উদ্বেগের কারণও কম নয়। গত ২৬ মার্চ রাজবাড়িতে কিশোরকে বাড়ির বাইরে যেতে মা বাধা দেওয়ায় এক কিশোর গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। অনেক পরিবারেই শিশুরা বিদ্রোহ করছে। অনেকের আচরণ অস্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। শিশুরা অনেক বেশি রাগি বা জেদি হচ্ছে। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করতেও চাচ্ছে না। ফলে তাদের শান্ত রাখা কঠিন হচ্ছে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ‘এখন শিশুরা মুক্তভাবে চলাফেরা করতে পারছে না, ফলে তাদের মধ্যে কিছু অস্বাভাবিকতা দেখা যাবে সেটাই স্বাভাবিক। এখন তাদের আচরণেও পরিবর্তন আসতে পারে। এই সময়টাতে অভিভাবকরা সঠিকভাবে শিশুদের দেখভাল করতে না পারলে বড়ো ধরনের ক্ষতি হতে পারে। মূল কথা এখন শিশুদের অনেক বেশি সময় দিতে হবে। ছোটো বাচ্চা যারা অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলনা নিয়ে খেলা করে তাদের সঙ্গে এখন অভিভাবকদেরও খেলতে হবে। তারা যেন আনন্দের সঙ্গে সময় কাটাতে পারে সেই ব্যবস্থাটা করতে হবে। ভিডিও গেমের খারাপ দিক আছে। আবার কিছু সৃজনশীলতাও আছে। ফলে নির্দিষ্ট সময়ে তাদের এটা দিতে হবে। গান গাওয়া, ছবি আঁকা, মজার সিনেমা দেখা এগুলো সব এক সঙ্গেই করতে হবে। যেসব বাচ্চা এতদিন ইউটিউবে আসক্ত ছিল এখন তাদের সেখান থেকে ফেরানোর একটা সুযোগ। মনে রাখতে হবে, ঘরের মধ্যে বাবা-মা উদ্বিগ্ন থাকলে বা আতঙ্কিত থাকলে সেটা কিন্তু শিশুদের মনেও প্রভাব পড়ে। বাবা-মা ঝগড়া করলে শিশুদের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে মনোযোগ না দিলে শিশুদের সহানশীলতা বা ধৈর্য কমে যেতে পারে। এখন কিন্তু শিশুদের পছন্দের খাবার মায়েরা রান্না করে দিতে পারেন।’

স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের পরে, বাবা-মা এবং ইয়ুথদের মধ্যে পোস্টট্রোম্যাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার সম্পর্কিত এক গবেষণায় দেখা যায়, গড়পড়তাজনিত স্ট্রেস স্কোরগুলো গৃহবন্দি থাকা শিশুদের অন্য স্বাভাবিক শিশুদের তুলনায় চার গুণ বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই অস্থির সময়ে শিশুদের শারীরিক এবং মানসিক প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংসদ টিভির মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখার একটি উদ্যোগ নিয়েছে, সেটা ভালো। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে, কোর্সগুলোর বিষয়বস্তু যেন শিক্ষাগত প্রয়োজনীয়তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়।