চুরি যদি কাহারো স্বভাবে বা মনস্তত্ত্বে ঢুকিয়া যায়, তাহা হইলে তিনি সুযোগ পাইলে চুরি করিবেনই। শুনা যায়, কিছু কিছু স্বর্ণকার গহনা গড়াইতে গিয়া একটুখানি সোনা সরাইবার ব্যাপারে এতটাই অভ্যস্ত হইয়া পড়েন যে, নিজের মায়ের সোনার গহনা তৈরি করিবার সময়ও নাকি সেইখান হইতে সোনা সরাইয়া রাখেন! চুরির ব্যাপারে বাঙালি সমাজের মনস্তত্ত্ব একটু অন্যরকম। কৈশোরে অন্যের গাছের আম চুরি করা, কাহারো বাড়িতে খেজুরের রস চুরি করার মতো দুষ্টুমি লইয়া বাঙালিরা একে-অন্যের নিকট গর্বের সহিত বর্ণনা করেন। সেই বাঙালিই আবার রাস্তায় চোর পাইলে তাহাকে দুই ঘা দিতে কুণ্ঠিত হয় না। পেশাদার চোরেরা মনে করেন, উহাই তাহাদের পেশা, ইহাতে অপরাধের কিছু নাই। কথাসাহিত্যিক মনোজ বসু তাহার বিখ্যাত ‘নিশিকুটুম্ব’ উপন্যাসে চোরদের মনস্তত্ত্ব বর্ণনা করিয়াছেন। সেইখানে দেখা গিয়াছে, বংশপরম্পরায় যাহারা চোর তাহাদের মধ্যেও কিছু নৈতিকতা রহিয়াছে। চুরি করিতে গিয়া দ্বিধায় পড়িলে দেবতার কাছে প্রার্থনা করেন—‘হে মা-কালী, আমায় মন্দ করে দাও।’ এই সকল চোর দয়ালুও হয় বটে। চুরি করা বাড়ির লোকজন যেন অভুক্ত না থাকে, সেই দিকে বিশেষ নজর থাকে তাহাদের।
কিন্তু সম্প্রতি এই করোনার অভাবিত দুর্যোগকালে আমাদের দেশে যাহারা ‘কাঙালের ভাত’ চুরি করিতেছেন, তাহারা মনুষ্য পদবাচ্যের কি না তাহা সন্দেহের অবকাশ রহিয়াছে। ইতিমধ্যে করোনার কারণে সকল কিছু লকডাউন থাকায় দেশের ৭০ শতাংশ মানুষের আয় বন্ধ হইয়া গিয়াছে। দেশে এখন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৩ কোটি ৮২ লক্ষের কাছাকাছি। তাহারা কী করিয়া বাঁচিবেন? এই সকল নাঙ্গাভুখা মানুষ ত্রাণসামগ্রীর জন্য চেয়ারম্যান, মেম্বার ও কাউন্সিলরদের দ্বারে দ্বারে ঘুরিতেছেন, জঠরজ্বালায় রাস্তায় নামিয়াছেন, খোলাবাজারে চাউল বিক্রির জন্য দাঁড়ানো ট্রাকের সামনে লাইন দিতেছেন করোনার ঝুঁকি লইয়াও। করোনার চাইতেও উহাদের নিকট না খাইয়া মরিবার ভয় বেশি। এই জন্য দেশের প্রধান নির্বাহী এই দরিদ্র অভুক্ত জনগোষ্ঠীকে বাঁচাইতে সম্ভাব্য সকল ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছেন; কিন্তু বঙ্গবন্ধু যেমন আক্ষেপ করিয়াছিলেন যে, তিনি চোরের খনি পাইয়াছেন, বঙ্গবন্ধুকন্যাও যেন শত শত শৃগালকে দায়িত্ব দিয়াছেন কোটি কোটি মুরগি বিতরণের জন্য। এই সকল শৃগাল যাহা করিবার তাহাই করিতেছে, মুরগিগুলি লোপাট করিতেছে। প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারিতেও থামিতেছে না ত্রাণ চুরি। ত্রাণ বিতরণে অনিয়মের জন্য বুধবার পর্যন্ত ইউনিয়ন পরিষদের ৯ চেয়ারম্যান এবং ১২ সদস্য সাময়িক বরখাস্ত হইয়াছেন। অনেককে ভ্রাম্যমাণ আদালতে শাস্তি দেওয়া হইয়াছে; কিন্তু এই চোর ধরিবার সংখ্যা হিমবাহের চূড়া মাত্র, তলে রহিয়া গিয়াছে বিশাল বহর।
এই চোরদের কী করা উচিত—যাহারা ক্ষুধার্ত মানুষের অন্ন কাড়িয়া লয়! এই চুরি সীমাহীন অনৈতিকতার। গরিবের চাল চুরি করিতে যাহাদের লোভের জিহ্বা লকলক করিতেছে, চাউল চুরি করিতে করিতে লোভের জিহ্বা লম্বা হইয়া গিয়াছে, রাষ্ট্রকে সেই সকল বিষাক্ত জিহ্বা কাটিতেই হইবে। এই চোরদের উচিত শাস্তি পাইতেই হইবে, সেই শাস্তি যত ভয়ানকই হউক না কেন।