বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি ভালো আছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে তিনি চলমান এপ্রিল মাসে যেন সংক্রমণ অধিকহারে বাড়তে না পারে সেজন্য সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘এপ্রিল মাসটি আমাদের জন্য একটু কষ্টকর হবে। এ মাসে আরো সাবধানে থাকতে হবে। তারপরও ইউরোপ-আমেরিকায় যে পরিমাণ রোগ সংক্রমিত হয়েছে তার তুলনায় আমাদের দেশে কম।’ দেশ-বিদেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে বাংলাদেশিদের মৃত্যুতে তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী গতকাল সোমবার সকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের আট জেলার কর্মকর্তাদের কোভিড-১৯ মহামারি প্রতিরোধে বিভিন্ন নির্দেশনা দেন। এ সময় তিনি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি খুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে উল্লেখ করে, অতীতে চিন্তাভাবনা না করেই হঠাত্ কারখানা খুলে দিয়ে কর্মীদের ঢাকায় আসার ঘোষণা দেওয়ায় অনেকেই যে সমস্যায় পড়ে যান, সে প্রসঙ্গও টেনে আনেন। অবশ্য কিছু কিছু শিল্পকারখানা খুলে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই বলেও তিনি জানান।
শেখ হাসিনা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন মেডিক্যাল সামগ্রী বুঝে নেওয়ার ক্ষেত্রে কেবল মোড়ক না দেখে ভেতরের বস্তুটিও দেখে এবং বুঝে নেওয়ার নির্দেশ দেন। এ ধরনের কিছু অভিযোগ তার নিকট আসারও ইঙ্গিত দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্যকর্মীদের এন-৯৫ মাস্কের মোড়কে সাধারণ মাস্ক দেওয়া নিয়ে আলোচনার মধ্যে এ বিষয়ে নজরদারি বাড়াতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও কেন্দ্রীয় ঔষধাগারকে নির্দেশ দেন। পরে এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শহিদ উল্লাহ ব্যাখ্যা দিতে গেলে তাকে থামিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এন-৯৫ লেখা আপনাদের বক্সে। কিন্তু ভিতরের যে জিনিসটা, সেটা সঠিক থাকে কি না, এটা একটু আপনাদের দেখা দরকার।’ এ সময় মাস্ক ও অন্যান্য মেডিক্যাল সামগ্রী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে নজরদারি কঠোর করার নির্দেশনা দেন তিনি।
স্বাস্থ্যবিধি না মানায় মানুষ নতুন করে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে জানিয়ে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ আরেকটু সচেতন হয়ে নিজেদের সুরক্ষিত রাখলে কোভিড-১৯ মহামারি নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। তিনি বলেন, ‘সারা বিশ্বে যেখানে হাজার হাজার লোক প্রতিদিনই মারা যাচ্ছে সেখানে বাংলাদেশে—এপ্রিল মাসের আজকে ২০ তারিখ, এখন পর্যন্ত আমরা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছি। আমি মনে করি যে আমাদের জনগণ যদি আরেকটু সচেতন থাকেন, আরেকটু নিজেদের সুরক্ষিত রাখেন তাহলে এটা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। আমি আশা করি সবাই করবেন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবে দেশে খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষকদের উত্পাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকরণে চলতি মৌসুমে ২১ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আসন্ন রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর সরবরাহ সঠিক রাখতে সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ করবে উল্লেখ করে তিনি বাজারে পণ্য সরবরাহ বজায় রাখতে মনিটরিং জোরদারকরণেও প্রশাসনকে নির্দেশ দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের খাদ্যের কোনো অভাব হবে না। তাছাড়া এখন ধান উঠছে। ধান কাটাও শুরু হয়ে গেছে। আগামীতেও ফসল উঠবে। সেই সঙ্গে তরিতরকারি ফলমূল যে যা পারেন উত্পাদন করবেন।’ ধান কাটায় সহযোগিতার জন্য তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক এবং ছাত্র সমাজের প্রতি তার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে ৯৫ হাজার ৬১৯ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছি, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। কৃষি খাতে মাত্র ৪ শতাংশ সুদে আমরা কৃষি ঋণ দিচ্ছি। যে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে, তা শুধু এই বছরের জন্য না। আগামী তিন বছর দেশের অর্থনীতির চাকা যাতে সচল থাকে সেটা মাথায় রেখেই এই প্রণোদনা। এটা অব্যাহত রাখা হবে।’
শেখ হাসিনা সামাজিক নিরাপত্তাবলয়ের কর্মসূচির আওতায় নতুন ৫০ লাখ লোকের তালিকায় দলমত নির্বিশেষে যাদের প্রয়োজন সেরকম কেউ যেন বাদ না পড়ে এবং যারা হাত পাততে পারেন না তেমন কেউ যেন খাদ্য সাহায্য বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে নির্দেশ দেন। ত্রাণ বিতরণে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং যে কোনো ধরনের অনিয়ম দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার সরকারের কঠোর অবস্থানের কথাও প্রধানমন্ত্রী সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেন। সারাদেশে করোনা চিকিত্সায় কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করার জন্য ৫০৭ প্রতিষ্ঠান প্রস্তুত রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘করোনার কারণে সারা বিশ্ব আজ আতঙ্কিত। গোটা বিশ্বের অর্থনীতি স্থবির। বন্ধ রয়েছে মসজিদ-মন্দির-গির্জা, প্যাগোডাসহ সব প্রার্থনাকেন্দ্র।’ সবাইকে ঘরে বসেই নামাজ আদায় করার এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দুর্যোগে ভেঙে পড়া যাবে না। শিগিগর সংকট কেটে যাবে। সাহসের সঙ্গে আমাদের এই সংকট মোকাবিলা করতে হবে।’
ভিডিও কনফারেন্সে জেলা প্রশাসনসহ মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, সিভিল সার্জনসহ চিকিত্সক, ইমাম, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিনিধি এবং স্থানীয় সাংবাদিকসহ ঢাকার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং আইইডিসিআর সংযুক্ত ছিল। জেলাগুলো হচ্ছে—ঢাকা বিভাগের মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জ এবং ময়মনসিংহ বিভাগের জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহ। ভিডিও কনফারেন্সে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব বজায় না রেখে দায়িত্বশীলদের বসা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস ভিডিও কনফারেন্সটি সঞ্চালনা করেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম, পিএমও সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া এবং প্রেস সচিব ইহসানুল করিম গণভবন প্রান্তে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন।