সংকটে ‘গৃহবন্দি মধ্যবিত্তরা’

করোনা ভাইরাসের কারণে গৃহবন্দি মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্তরা কঠিন অর্থকষ্টে ভুগছেন। সরকারঘোষিত ছুটির কারণে কেউ গেছেন গ্রামের বাড়িতে কেউ আছেন ঢাকার বাসায় বন্দি। আর্থিক সংকটে অনেকে ভাড়াটিয়া দিতে পারেননি চলতি মাসের বাড়িভাড়া। বাড়িওয়ালা দুর্ব্যবহার এমনকি বাসা থেকে জোর করে বের করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। আবার কারো কারো ঘরে নেই খাবার। এমন পরিস্থিতির মধ্যে এদের বড়ো একটি অংশ চাকরি হারানোর আতঙ্কে ভুগছেন।

তারা বলছেন, গত এক মাস তারা গৃহবন্দি। অনেক কোম্পানি তাদের স্টাফদের বেতন দেয়নি। চলতি মাসে কাজ ছাড়া আগামী মাসে বেতন দেবে কি না, সেটি নিয়েও সন্দিহান। এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন ভাড়াটিয়ার সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। চলতি মাসের বাসাভাড় না দেওয়ার কারণে বাসার মালিকেরা প্রচণ্ড মানসিকচাপে রেখেছেন ভাড়াটিয়াদের। ভাড়া দিতে না পারায় তিন শিশুসহ এক দম্পতিকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছেন কলাবাগানের কাঁঠালবাগানের এক বাড়ির মালিক।  গত শনিবার মধ্যরাতে ঐ দম্পতিকে বের করে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় বাড়ির মালিকের বিরুদ্ধে কলাবাগান থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।

কুলসুম-সেলিম দম্পতি জানান, তারা প্রতি মাসে ভাড়া পরিশোধ করেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে এক মাসের ভাড়া বকেয়া পড়েছে। এতে বাড়িওয়ালার কাছে অনেক অনুনয় করেছেন। কিন্তু বাড়িওয়ালা তাদের কোনো কথা শোনেননি। পরে বাড্ডায় এক স্বজনের বাসায় ঠাঁই হয় তাদের।

কলাবাগান থানার ওসি পরিতোষ চন্দ্র বলেন, শনিবার রাতে বাড়ির মালিক সম্পা আক্তার থানায় মৌখিকভাবে অভিযোগ করেন তার ভাড়াটিয়া তাকে মারধর করেছেন। তবে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে এর কোনো সত্যতা পায়নি। মূলত ভাড়াটিয়াকে বাসা থেকে বের করে দেওয়ার জন্যই তিনি পুলিশের কাছে এই অভিযোগ করেন। বাড়ির মালিক সম্পা আক্তার বলেন, ওরা ভাঙচুর করেছে। মারধর করেছে। আমার আব্বা সচিবালয়ে চাকরি করেন, ভাই র্যাবে চাকরি করেন। তাদের জিজ্ঞেস করেন কেন বের করে দিয়েছে।

এ সময় বাড়ির মালিককে অনুরোধ করা হয় যাতের রাতের বেলা ভাড়াটিয়াকে বের না দেওয়া হয়। দিনের বেলায় পুলিশ বিষয়টি দেখবে। এরপর পুলিশ চলে আসার পর ঐ দম্পতিকে বের করে দেওয়া হয়।

কল্যাণপুরের ১১ নম্বর রোডের একটি বাসার তৃতীয় তলায় থাকেন এক দম্পতি। সম্প্রতি তারা ঐ বাসায় উঠেছেন। এখন পর্যন্ত চলতি মাসের বাসা ভাড়া দিতে পারেনি। এতে রেগে এবং ক্ষেপে আছেন ফ্ল্যাটের মালিক। ঐ ফ্ল্যাটের মালিক চট্টগ্রামে থাকেন। টেলিফোনে ভাড়াটিয়াকে তিনি বলেন, আমি এতিমখানা খুলে বসিনি। ভাড়া দিতে না পারলে চলে যান।

খাবার নেই অনেকের ঘরে : আরাবিয়া (৪৫)। নিজের বাসায় দর্জির কাজ করেন। তার স্বামী ছোটোখাটো কাজ করেন। তিন মেয়ে নিয়ে কোনোমতে সংসার চলে তাদের। করোনায় স্বামী-স্ত্রীর কোনো কাজ না থাকায় তীব্র খাবার সংকটে পড়েন ওই দম্পতি। নিরুপায় হয়ে এই প্রতিবেদককে ফোন করে ত্রাণের কথা বলেন। এরপর ঐ পরিবারকে ত্রাণের জন্য প্রথম হেল্পলাইন ৯৯৯ এ ফোন করে সাহায্যর কথা বলা হলে তারা দারুস সালাম থানার ওসিকে দেন। থানার ওসিকে ঐ পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর কথা বললে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে ফোনে উত্তর সিটির ১১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলরকে ঐ পরিবারটির ত্রাণ দেওয়ার কথা বললে সাহায্য করার নিশ্চয়তা দেন। সেই মোতাবেক ওই কাউন্সিলরকে পরিবারটির মোবাইল নম্বর এবং ঠিকানা পাঠানো হয়। টেলিফোন করে এসএমএস পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চত করা হয়। কিন্তু দুই দিন অতিবাহিত হলেও কাউন্সিলর ঐ পরিবারটির সাহায্য করেননি। পরে বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সেন্টার ফর দ্য রাইটস অব ডিজঅ্যাবেলিটি-সিডিআর ওই পরিবারটির সাহায্য এগিয়ে আসে। শুধু ঐ দম্পত্তি নন—এমন অসংখ্য মধ্য বা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার খাবার সংকটে আছে। আবার অনেকে চক্ষুলজ্জায় মানুষের কাছে সাহায্য চাচ্ছেন না। নিরুপায় হয়ে গৃহবন্দি মধ্য-নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা ডুকরে কাঁদছেন।

আছে চাকরি হারানোর শঙ্কা : মোহাম্মদপুরে থাকেন ফরিদুল ও মুসলিম দম্পত্তি। একটি  ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কোম্পানিতে চাকুরি করেন ফরিদ। তার স্ত্রী মুসলিম একটি স্কুল চাকুরি এবং টিউশন করে সংসার চালান। করোনার কারণে স্ত্রী বেতন পাননি। ফরিদ অর্ধেক বেতন পেয়েছেন। কোনোমতে চলছে সংসার। কিন্তু এখনো বাসাভাড়া দিতে পারেননি। তাদের শঙ্কা প্রায় এক মাস কাজ নেই। সামনের মাসে চাকরি থাকবে কি না জানি না, এমনকি চলতি এপ্রিল মাসে বেতন না পেলে ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে যেতে হবে পরিবারটির। তাদের মতো অনেকেই আছেন চাকরি হারানোর আতঙ্কে।