ক্যাপ্টেন শামস উজ জামান
আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে একটি টেলিভিশন চ্যানেল দেখছিলাম। টকশোটির আলোচনার বিষয়বস্তু মূলত প্রতিদিনের মতো একই রকম—দেশের লোকজনের ব্যক্তিগত কিংবা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, সেসব না মানলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তাদের পশ্চাদেদশে দুই ঘা বেত্রাঘাত করবেন কি না, দেশে আইসিইউ, চিকিত্সক-নার্স অথবা পিপিই ইত্যাদির অবস্থা কেমন, আক্রান্ত বা মৃত ব্যক্তির সংখ্যা কত ইত্যাদি, ইত্যাদি।
এসব কথা প্রায় প্রতিদিনই দুপুর দুইটায় সরকারি কর্তাব্যক্তিদের ব্রিফিং এবং অন্য সময়গুলোতে টেলিভিশনের বিভিন্ন চ্যানেলে কম-বেশি বারবার দেখছি ও শুনছি। তবে আজকের টকশোতে শোনা একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করার জন্যই মূলত এ লেখাটি লিখছি।
শুনলাম, দেশের কোনো একটি জেলায়, এক জন সম্মানীয় মহিলা ডাক্তার করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি সেখানকার একটি ভাড়াবাড়িতে বসবাস করেন। তার করোনা ভাইরাস ধরা পড়ার পর বাসায় ফিরে এলে, বাড়ির মালিক তাকে বাসায় ঢুকতে নিষেধ করেন। বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয় লোকজন, জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানান এবং তার নির্দেশ ও লোকজনের চাপে পড়ে বাড়ির গৃহকর্তা ঐ ডাক্তার মহিলাকে তার বাসায় থাকার অনুমতি দিতে বাধ্য হন। বিষয়টি কেমন যেন হলো না?
বর্তমানে বিশ্ব জুড়ে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হবার ভয়ে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে আছেন। আমাদের সরকারও এ মরণব্যাধি থেকে মানুষজনকে রক্ষা করার জন্য ‘আইসোলেশন’ ইত্যাদির কার্যক্রম গ্রহণ করেছেন, যাতে এ রোগটি আমাদের দেশেও মহামারি আকারে ছড়িয়ে না পড়ে। সেরকম একটি পরিস্থিতিতে, বাড়ির মালিককে চাপ না দিয়ে, করোনা আক্রান্ত ডাক্তার মহিলাকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় অ্যাম্বুলেন্সে করে (দরকারে ভাড়াকৃত) যে কোনো ‘আইসোলেশন সেন্টার’ অথবা আইসিইউ-সমৃদ্ধ হাসপাতালে নিয়ে চিকিত্সা করানো উচিত ছিল নাকি? তবে এখানে কথা থাকে যে, আমি জানি না ডাক্তার ভদ্রমহিলা শুধু করোনা ভাইরাসের ‘সিমটোমেটিক স্টেজে’ ছিলেন কি না। সেক্ষেত্রে বাড়ির মালিকের পক্ষে নমনীয় আচরণ করাটাই সঠিক হতো।
‘আমরা যদি ধরেও নিই, গ্রীষ্মপ্রধান দেশ হিসেবে আমাদের দেশে এ রোগটি মহামারি হিসাবে নাও দেখা দিতে পারে। (এমনও হতে পারে আমাদের দেশের জনগণের রোগপ্রতিরোধক্ষমতা এমনিতেই বেশি) তার পরও আমাদের ন্যূনতম কিছু পূর্বপ্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে, বিন্দুমাত্র দেরি না করে, হোম কোয়ারেন্টাইন, ব্যক্তিগত/সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, পর্যাপ্ত আইসোলেশন সেন্টার তৈরি করা ইত্যাদিসহ আমরা অন্তত ২-৪ হাজার আইসিইউ বেড প্রস্তুত করার ব্যবস্থা নিতে পারি। আইসিইউ বানানোর জন্য আমাদের হাসপাতালগুলোতে জায়গা সংকুলান না হলে, দেশে বেশ কিছু হোটেল, কমিউনিটি সেন্টার আছে। এসব স্থানে আইসিইউগুলো স্থাপন করা যেতে পারে। আমি নিশ্চিত, এ কাজে আমাদের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী স্বতঃস্ফূর্তভাবে সহযোগিতা করবে।
যুদ্ধকালীন অবস্থায় আমাদের সেনাবাহিনী যখন দু-চার দিনের চেষ্টায় একটি ভাসমান সেতু, ফিল্ড হাসপাতাল অথবা সৈনিক থেকে জেনারেল সাহেবদের পর্যন্ত থাকা-খাওয়ার জন্য ‘মেইক শিফট’ ব্যবস্থা করে দিতে পারেন, সেক্ষেত্রে তাদের পক্ষে এ ধরনের আইসোলেশন সেন্টার/আইসিইউ অথবা ডাক্তার-নার্স-সহযোগিদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া তেমন কোনো কঠিন কাজ নয় বলেই আমার বিশ্বাস।
আমার জানামতে, দেশে একমাত্র সরকারি পর্যায়েই ১ হাজারের বেশি অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট ডাক্তার আছেন। নার্স ও সহযোগিদের সংখ্যাও কম নেই। এদের মধ্য থেকে এসব আইসিইউগুলো পরিচালনা করার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক ডাক্তার-নার্স-সহযোগিদের বেছে নিয়ে, এই আপত্কালের জন্য তাদের সবার বেতন বাড়িয়ে এবং গ্রুপ বিমার আওতায় আনা গেলে, আমার বিশ্বাস, তারা এ কাজে অংশ নিতে রাজি হবেন। ১৫ দিনের একটি ‘ক্রাশ প্রোগ্রামের’ মাধ্যমে তাদেরকে প্রশিক্ষিত করে তোলা সম্ভব। তবে, এসব কাজ আমাদের বর্তমান স্বাস্থ্য বাজেটের টাকা দিয়ে করানো সম্ভব নয়। এ কারণেই আমরা হয়তো প্রায়শই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যক্তিদের কাছ থেকে টেলিভিশনে ‘এই হচ্ছে, এই করব...’ এমন কথাগুলো শুনে থাকি। তাছাড়াও বর্তমান অবস্থাদৃষ্টে আমার কেন জানি মনে হয়—আমাদের প্রশাসন, বিএমএ, স্বাচিপ, বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ এবং হাসপাতাল অ্যাসোসিয়েশনগুলোর নেতারাও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছে তার কাছে উপরিউক্ত বিষয়গুলো সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারছেন না বা ধরছেন না।
পরিশেষে, আমার নিজস্ব ধারণা—প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে শুধু সাধারণ রোগীদের চিকিত্সা দেওয়া উচিত। এসব হাসপাতালে রোগী ভর্তি করানোর আগে কর্তৃপক্ষ চাইলে হাসপাতালের নির্দিষ্ট কোনো স্থানে এসব রোগী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত কি না, তা পরীক্ষা করে নিতে পারেন। এ ব্যবস্থা ছাড়া, জোর করে এসব হাসপাতালে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী ভর্তি করাতে চাইলে হিতে বিপরীত হবার সম্ভাবনা বেশি থাকবে বলে আমার ধারণা।
n লেখক :মাস্টার মেরিনার (আয়ারল্যান্ড) এএফএনআই (লন্ডন) ও শিপিং কনসালট্যান্ট