তেলের মূল্য নামল শূন্যের নিচে

বিশ্বব্যাপী ঘরবন্দি মানুষগুলোর চিত্ত অস্থির হয়ে উঠছে। কর্মঠ হাতগুলো কত দিন আর কর্মহীন থাকতে পারে! তাদের যখন কাজে ছুটে যাওয়ার তীব্র আকুতি, ঠিক তখনই নতুন অস্বস্তি এনে দিয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্য। শূন্যের নিচে নেমে যাওয়ায় এটি স্পষ্ট যে শিগিগর শুরু হচ্ছে না অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ। চাহিদা নেই, সরবরাহব্যবস্থাও নেই। তাই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে উত্তোলনকৃত তেল নিয়ে বিপাকে উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান। কেন এমন অবস্থা হলো? এই পরিস্থিতি এমন ইঙ্গিতই দিচ্ছে যে নিকট ভবিষ্যতে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা ক্ষীণ।

বিশ্ব এখন করোনাক্রান্ত। অর্থনীতি ঢুকে পড়েছে মহামন্দায়। সমসাময়িক ঘটনা। সৌদি আর রাশিয়ার তেলযুদ্ধ। ত্রিশঙ্কু অবস্থায় বিশ্ব অর্থনীতি। গতি থামিয়ে দেওয়া পরিস্থিতিতে তেলের মূল্যহ্রাসের ঘটনা অজানা আশঙ্কায় ফেলে দিল বিশ্বকে। পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার নতুন কৌশল নিয়ে ভাবতে হবে ধনী-গরিব সবাইকে। সোমবারের কথা। ইতিহাসে এই প্রথম তেলের মূল্যের রেকর্ড পতন ঘটেছে এ দিন। শূন্যের নিচে নেমে যাওয়ায় তেল নিয়ে বিপাকে উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান, যার প্রভাবে অস্থিরতা শেয়ারবাজারেও। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি থেকে তেল আমদানি সাময়িক স্থগিত করতে যাচ্ছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বব্যাংক আগেই পূর্বাভাস দিয়েছিল যে জ্বালানি তেলের দাম কমে যাবে। মধ্যিখানে রাশিয়া আর সৌদি আরব অংশ নিল মূল্যযুদ্ধে। তেলের দাম নিয়ে এই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় সায় ছিল চীনেরও। উদ্দেশ্য কি তবে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অন্য দেশগুলোকে শিক্ষা দেওয়া? তারই ফল, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তেলের মূল্যহীন হয়ে পড়া। এই তেল রাজনীতির ভবিষ্যত্ কোন দিকে নিয়ে যাবে বিশ্বকে, সেটি এখনই আঁচ করা যাচ্ছে না। তবে বাংলাদেশের মতো দেশ তেলের দাম কমলে লাভবান হতো, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কেউই এর সুফল পাচ্ছে না। অতীতে আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ার ফলে তেলের মূল্য কমায় বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় কমেছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিতেও বড়ো ভূমিকা রেখেছিল।

সর্বশেষ মূল্যপরিস্থিতি :উত্তোলিত তেল সংরক্ষণাগারে রাখার জায়গা না থাকায় বিপাকে উত্পাদকেরা। ফলে মে মাসের জন্য তেল কেনার গ্রাহক                 পাওয়া যাচ্ছিল না। এতে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম গতকাল মাইনাস ৩৭ দশমিক ৬৩ ডলারে নেমে আসে। অর্থাত্, মে মাসে ক্রেতাকে প্রতি ব্যারেল তেলের সঙ্গে এই পরিমাণ অর্থও দিতে রাজি হয়েছে উত্পাদকেরা। চাহিদা না থাকা এবং উত্পাদন অব্যাহত থাকায় মে মাসেই তেল মজুতের আর জায়গা থাকবে না এমন আশঙ্কার কারণে এই পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের ব্র্যান্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমেডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম মঙ্গলবার কিছুটা বেড়ে ১ দশমিক ৩৭ ডলারে বিক্রি হয়। 

নেপথ্যে কী ছিল

তেলের দাম নিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা চলছিল। ‘প্রাইস ওয়ার বা মূল্যযুদ্ধে’ নেমেছিল রাশিয়া ও সৌদি আরব। দুই দেশই বৃহত্ তেল উত্পাদনকারী দেশ। উত্তোলন বাড়িয়ে দেওয়ায় বাজারে মূল্য যায় কমে। তেল উত্পাদনকারী দেশগুলোর সংগঠন ওপেক উত্তোলন কমিয়ে দাম ঠিক রাখতে চাইলেও রাশিয়া সম্মত না হওয়ায় এপ্রিলের শুরুতেই তেলের দামে ১৮ বছরের মধ্যে রেকর্ড পতন ঘটে। সৌদি আরব পালটা পদক্ষেপ হিসেবে উত্তোলন বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। শুরু হয় তেল নিয়ে ‘মূল্যযুদ্ধ’। এদিকে করোনা ও মন্দায় চাহিদা কমে যাওয়া, অন্যদিকে মূল্যযুদ্ধে তেলের মূল্য ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। এমন অবস্থায় ওপেক তেল উত্তোলন কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়। রাশিয়াও সম্মত হয় তাতে। কিন্তু ধারাবাহিক চাহিদা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আর স্বাভাবিক থাকেনি।

প্রভাব শেয়ারবাজারেও

তেলের বাজারে ধস নামায় ধাক্কা লাগে বিশ্ব শেয়ারবাজারেও। লন্ডনের এফটিএসসি ১০০ সূচক কমে যায় ১ দশমকি ৪ শতাংশ। জার্মানি ও ফ্রান্সের শেয়ারবাাজরে দর কমে যায় ১ দশমিক ৮ শতাংশ। এদিকে এশিয়ার বড়ো শেয়ারবাজার জাপানের নিক্কি ২২৫ সূচক কমে যায় ২ শতাংশ, চীনের সাংহাই কম্পোজিট সূচক কমে শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ।

শিগিগর সচল হবে না অর্থনীতির চাকা

বিশ্লেষকেরা বলেছেন, তেলের মূল্যের এই ধস আগামী দিনের সমস্যার ইঙ্গিতই করছে। জ্বালানি তেলের দামের এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে পূর্বাভাস অনুযায়ী বড়ো-ছোটো সব অর্থনীতির দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি কমবে। ফলে শিগিগর তেলের চাহিদা বাড়বে না। এ অবস্থায় বিশ্ব অর্থনীতি আগামী দিনগুলোতে কঠিন সময়ের মুখোমুখি হবে। তার ইঙ্গিত সুস্পষ্ট হচ্ছে। বাড়ছে আতঙ্কও।