লকডাউন মানিতেই হইবে

নোভেল করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে এই বিশ্বের নিকট লকডাউন ব্যতীত আপাতত আর কোনো সহজ উপায় নাই। যদিও লকডাউনের কারণে অর্থনীতিসহ মানুষের জীবনযাত্রা একরকম স্থবির হইয়া গিয়াছে। কিন্তু প্রশ্নটি যখন জীবন-মরণের তখন লকডাউন তো মানিতেই হইবে। এই ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিয়াছে। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশই ধাপে ধাপে লকডাউন বৃদ্ধি করিতে বাধ্য হইতেছে। উপায়ান্তর না থাকায় আমাদেরও লকডাউনের সময়সীমা বাড়াইতে হইবে বইকি। ইহার জন্য যাহারা সবচাইতে বিপদে পড়িতেছেন, সেই দরিদ্র শ্রেণিসহ বিপদাপন্ন সকল মানুষের জন্য যাবতীয় সহায়তা প্রদানের মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা আবশ্যক। আর লকডাউন যাহাতে সফল হয়, তাহার জন্য সকলের সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন প্রশাসনের কঠোর নজরদারি। বিশেষ করিয়া, করোনা ভাইরাস যখন ৫৫ জেলায় ছড়াইয়া পড়িয়াছে, তখন আর অবকাশ নাই লকডাউনকে হালকাভাবে গ্রহণের।

করোনার সংক্রমণ সবচাইতে বেশি হইয়াছে ঢাকা বিভাগে। আর হট স্পট হিসাবে ঢাকা জেলার পাশাপাশি উঠিয়া আসিয়াছে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী প্রভৃতি জেলার নাম। দেখা যাইতেছে, কঠোর লকডাউন সত্ত্বেও ‘বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো’র মতো অনেকেই অপ্রয়োজনে বাহিরে ঘুরাঘুরি করিতেছেন। অথচ করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাইতে এই সকল অঞ্চলে মানুষের চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করিবার কথা। নারায়ণগঞ্জ জেলায় প্রায় ১ কোটির বেশি মানুষের বসবাস। জানা গিয়াছে, ঐ জেলার মানুষ নিজ গ্রামে গিয়াছেও কম, আবার যাহারা গিয়াছে তাহাদের অনেকেই ফিরিয়া আসিয়াছে। ফিরিয়া আসা প্রবাসী শ্রমিক, শ্রমঘন শিল্পসহ নানা কারণে এই জেলা করোনা বিস্তারের ‘হট স্পট’ হইয়া উঠিয়াছে। ইহার পর ঢাকার পার্শ্ববর্তী গাজীপুর, নরসিংদী মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জেও করোনা বিস্তার লাভ করিয়াছে। গাজীপুরে অসংখ্য ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠান, খাবার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, পোলট্রি ফিড, ফিশ ফিড, ডেইরি ফিড প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলিই চালু রহিয়াছে। এইখানে যাহারা কাজ করিতেছেন তাহাদের নিয়মের মধ্যে রাখা দুরূহ।

এইদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় ভাইরাসটিতে নূতন করিয়া আক্রান্ত হইয়াছেন আরো ৩৯০ জন। মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াইয়াছে ৩ হাজার ৭৭২ জনে। এই সংখ্যা আয়ত্তের মধ্যে রাখিতে হইলে আমাদের কঠোরভাবে নিয়মকানুন মানিয়া চলিতেই হইবে। মনে রাখিতে হইবে, করোনা ভাইরাস ইবোলার চাইতেও সহজে ছড়াইতে পারে। করোনা ভাইরাস ও অতীতের অন্যান্য ভাইরাসের মধ্যে কয়েকটি স্বতন্ত্র জৈবিক পার্থক্য রহিয়াছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ইনফ্লুয়েঞ্জার ভাইরাস দ্রুত পরিবর্তিত হয়, যাহার ফলে উহা মানবদেহের সঙ্গে মানাইয়া যায় এবং আমাদের প্রতিরোধক্ষমতা তাহাকে রুখিয়া দিতে পারে। করোনার প্রথম পর্যায়ের আঘাত কিন্তু ততটা মারাত্মক ছিল না, কিন্তু দ্বিতীয় পর্যায়ে আসিয়া ভাইরাসটি নিজেকে পরিবর্তন করিয়া আরো বেশি সংক্রামক ও ভয়ংকর হইয়া উঠিতেছে। সত্যি কথা বলিতে, আর কোনো মহামারির কারণে পৃথিবী কখনো এইভাবে স্তব্ধ হইয়া যায় নাই। এপিডেমিওলজিস্টরা বলিতেছেন, অন্যান্য মহামারির চাইতে কোভিড-১৯ অধিক সময় পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় থাকিতে পারে। সুতরাং শত কষ্টের মধ্যেও লকডাউন আমাদের মানিয়া চলিতেই হইবে।