মানুষ বুকভরা আশা লইয়াই বাঁচিয়া থাকে। বিপদ-আপদ ও দুর্যোগের সময় শুনিতে চাহে আশার বাণী। বলা হইয়া থাকে, সূর্য ডুবিবার সময়ে কিছুক্ষণের জন্য আকাশে ভোরের মতো রং দেখা যায়, যাহাতে মানুষ আশা করে, কাল আবার সকাল হইবে। বর্তমানে করোনা মহামারির সময় আমাদের জন্যও কিছু আশার খবর তৈরি হইতেছে, যাহা কম আশাব্যঞ্জক নহে। জীবনের ঝুঁকি নিয়াও একশ্রেণির ডাক্তার-নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী দিনরাত্রি করোনারোগীর সেবা করিয়া যাইতেছেন। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজন কাজ করিয়া যাইতেছেন নিরলসভাবে। স্বেচ্ছাসেবকরা কত বিচিত্র উপায়ে উপকার করিতেছেন সাধারণ মানুষের। ত্রাণ বিতরণকারীরা অভুক্ত মানুষের সন্ধানে ছুটিয়া চলিয়াছেন। এমন সকল ইতিবাচক খবরের ভিড়ে উল্লেখযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ খবর হইল অবশেষে এই দেশেই তৈরি হইতেছে ভেন্টিলেটর। যেইখানে বিশ্বের উন্নত দেশগুলি করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় হিমশিম খাইতেছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত বলিতেছেন তাহাদের কাছে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটর নাই, সেইখানে ভেন্টিলেটরের সংকট কাটাইতে আমরা নিজেরাই যে উদ্যোগ লইয়াছি তাহা নিঃসন্দেহে সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।
করোনা সংক্রমণের আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করিলে দেখা যায়, এই ভাইরাসটিতে আক্রান্ত মানুষের মৃত্যুহার প্রায় ৭ শতাংশ (৬.৮৪%)। আর সুস্থ হওয়ার হার ২৬ শতাংশ। এখানেও আমরা আশার আলোই দেখিতে পাই। তবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে করোনায় মৃত্যুর হার সবচাইতে বেশি বাংলাদেশেই। বাংলাদেশের পর রহিয়াছে ভারত, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান। করোনা রোগীর জন্য সবচাইতে বড়ো সমস্যা হইল—একসময় তাহার শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হইয়া উঠিতে পারে। এই সময় অক্সিজেন সরবরাহের জন্য প্রয়োজন হয় ভেন্টিলেটরের। প্রয়োজন হয় তাহাকে আইসিইউ বেডে স্থানান্তরের। ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে করোনা রোগীদের জন্য ১২০টি আইসিইউ বেড প্রস্তুত করা হইয়াছে। কিন্তু যেই হারে মৃত্যুসংখ্যা বাড়িতেছে, তাহাতে আইসিইউ বেডের সংখ্যা বাড়াইতে হইবে। জেলা পর্যন্ত এই সুবিধা সম্প্রসারণ করিতে হইবে, নতুবা অনেককে বাঁচানো সম্ভব হইবে না।
ইতিমধ্যে করোনা ভাইরাস রোগীদের শ্বাসকষ্টের জন্য জরুরি চিকিত্সা সরঞ্জাম ভেন্টিলেটর বা অক্সিজেন যন্ত্রের উত্পাদন প্রক্রিয়া শুরু করিয়াছে দেশীয় প্রতিষ্ঠান মিনিস্টার হাইটেক পার্ক ইলেকট্রনিকস লিমিটেড। তাহাদের সহযোগিতা প্রদান করিতেছে আইসিটি মন্ত্রণালয়, এফবিসিসিআই, কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও বুয়েটের বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার টিম। চলতি মাসেই প্রথম লটে ১০০ ইউনিট ভেন্টিলেটর প্রস্তুত হইবে বলিয়া জানা যায়। পরবর্তী সময়ে ইহা চাহিদা অনুযায়ী বৃদ্ধি করা হইবে। এই ধরনের সংবাদ যে স্বস্তিদায়ক, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। দেশেই উত্পাদিত হওয়ায় ইহা পাওয়া যাইবে সাশ্রয়ী মূল্যে। দেশীয় এই ভেন্টিলেটর উত্পাদনের ফলে দেশের নির্মম আইসিইউ বাণিজ্যের অনেকটা অবসান হইবে বলিয়া আশা করা যায়। কেননা জেলা শহরে এমনকি অনেক মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ সেবা না থাকায় অনেক সময় আইসিইউ বেড খালি পাওয়া যায় না এবং ইহার কারণে অনেক রোগীর মৃত্যু হয়। আমাদের দেশে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মোট আইসিইউ বেড রহিয়াছে ১ হাজার ২৮৫টি। সরকারিভাবে আছে মাত্র ২১১টি। অতএব, করোনা বিদায়ের পর আমাদের স্বাস্থ্য খাতকে কীভাবে নূতন করিয়া ঢালিয়া সাজানো যায় এবং আইসিইউ বেডের সংখ্যা বৃদ্ধি করা যায়, সেই ব্যাপারে অবশ্যই চিন্তাভাবনা করিতে হইবে।